‘স্বাধীনতা কী, তা বোঝার বয়স ছিল না’: ৫ আগস্টের বিজয়োল্লাসে বুলেটের আঘাতে নিভে যাওয়া ৬ বছরের জাবিরের জীবন প্রদীপ
ঢাকা — স্বাধীনতা বা বিজয়ের আক্ষরিক বা ভাবার্থ কোনোটিই বোঝার বয়স ছিল না ছোট্ট মোহাম্মদ ইব্রাহিম জাবিরের। বয়স সবেমাত্র ছয় বছর। মাত্র ছয় মাস হলো সে স্কুলে যাওয়া শুরু করেছিল। কিন্তু ৫ আগস্ট ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের আনন্দ আর মানুষের বিজয়োল্লাস ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল ছোট্ট জাবিরকে। বাবা-মায়ের সঙ্গে সেই আনন্দের অংশীদার হতেই সেদিন সে বাইরে বেরিয়েছিল। কিন্তু কে জানত, বিজয়ের সেই আনন্দ উল্লাসই তার জীবনের শেষ দিন হয়ে দাঁড়াবে? উত্তরা পূর্ব থানার দিক থেকে আসা একটি অন্ধ বুলেট চিরতরে নিভিয়ে দিয়েছে জাবিরের প্রাণপ্রদীপ।
বাবার কোলে মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়া জাবির যমুনা টিভির বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার চূড়ান্ত বিজয়ের দিন উত্তরায় যখন মানুষের ঢল নেমেছিল, তখন নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে দুই সন্তানকে নিয়ে পথ চলছিলেন জাবিরের বাবা।
সেদিনের সেই ভয়ংকর স্মৃতির বর্ণনা দিয়ে জাবিরের বাবা জানান, ব্রিজের ওপর যখন মানুষ দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করছিল, তখন তিনি তার ছোট ছেলেকে ডান হাতে জড়িয়ে ধরে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার জন্য দৌড়াচ্ছিলেন। হঠাৎ করেই ছোট্ট জাবির ‘আহ’ বলে একটি আর্তনাদ করে ওঠে। ছেলের দিকে তাকিয়ে বাবা দেখতে পান, তার শরীর থেকে অঝোরে রক্ত ঝরছে। চোখের পলকে রক্তের স্রোতে ভাসতে থাকে ছোট্ট শরীরটি। উত্তরা পূর্ব থানার দিক থেকে ছুটে আসা একটি বুলেট কেড়ে নেয় নিষ্পাপ এই শিশুটির প্রাণ।
খেলনাগুলো যেন আজ সারাজীবনের অভিমান জাবির আজ নেই, কিন্তু তার পুরো বাড়ি জুড়ে রয়ে গেছে তার অজস্র স্মৃতি। তার পড়ার টেবিল, প্রিয় সাইকেলটি এবং খেলনাগুলো যেন নীরব ভাষায় অপেক্ষা করছে—এই বুঝি জাবির এসে তার আনন্দ ছড়িয়ে দেবে। কিন্তু তার মায়ের কোল আজ চিরতরে শূন্য। সন্তানহারা মায়ের আহাজারি আর বুকফাটা কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে চারপাশ।
সন্তান হারানোর চরম শোক বুকে নিয়েও জাবিরের বাবা-মা সংবাদমাধ্যমের কাছে এক আশার বাণী শুনিয়েছেন। তারা বলেন, জাবিরের মতো আর কোনো মায়ের বুক যেন এভাবে খালি না হয়। জাবিরের রক্ত ও আত্মত্যাগ তখনই সার্থক হবে, যখন দেশে সত্যিকারের একটি দুর্নীতিমুক্ত, বৈষম্যহীন ও নিরাপদ নতুন বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।
উপসংহার ৫ আগস্টের বিজয়ের আনন্দ যেমন কোটি মানুষকে ভাসিয়েছিল চোখের জলে, তেমনি ৬ বছরের শিশু ইব্রাহিম জাবিরের এই নির্মম মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয় এই স্বাধীনতার পেছনে রয়েছে এক রক্তক্ষয়ী ও মর্মান্তিক ইতিহাস। জাবিরের মতো নিষ্পাপ শিশুদের রক্তে কেনা এই নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন যেন কোনো দিন অপমৃত্যুর শিকার না হয়—এটাই আজ সমগ্র জাতির প্রত্যাশা।
Comments (0)
Login to leave a comment.
No comments yet. Be the first to comment.
Related posts
জুলাই ৩৬
‘আমার ছেলেরে মারলো ক্যান?’: পেটে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঝরে গেল ১০ বছরের শিশু হোসেনের তাজা প্রাণ
জুলাই ৩৬
‘হেলমেটধারীরা গুলি করে বাবাকে মারে’: রায়েরবাগের রাজপথে হেলমেট ও চাপাতি হাতে সেই তান্ডব মাথায় গুলি ও কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত’
জুলাই ৩৬