36July
জুলাই ৩৬

‘দাফন’ হওয়ার পরও মায়ের কোলে ফিরল রিফাত: আশুলিয়ার সেই লাশের স্তূপ থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরার এক অবিশ্বাস্য গল্প

by Ataullah Rahman Polas · · 1 views
‘দাফন’ হওয়ার পরও মায়ের কোলে ফিরল রিফাত: আশুলিয়ার সেই লাশের স্তূপ থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরার এক অবিশ্বাস্য গল্প

আশুলিয়া / ঢাকা — ৫ আগস্ট ২০২৪। স্বৈরাচার পতনের সেই ঐতিহাসিক দিনে বিজয়ের আনন্দ মিছিলে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছিল ১৯ বছরের তরুণ মো. রিফাত হোসেন। ছেলের খোঁজে হাসপাতালে ও থানায় ঘুরে বেড়িয়েছিলেন তার রাজমিস্ত্রী বাবা লুতফুর রহমান প্রামাণিক। একপর্যায়ে আশুলিয়া থানার সামনে পুলিশ ভ্যানে পুড়িয়ে দেওয়া লাশের স্তূপ থেকে একটি মরদেহের সঙ্গে দাঁত ও বাহ্যিক গঠনের মিল পেয়ে সেটিকে রিফাতের লাশ বলে নিশ্চিত হন তারা। বুকফাটা শোক নিয়ে সেই পোড়া ও শনাক্তের অযোগ্য মরদেহ গ্রামের বাড়ি বগুড়ার গাবতলীতে নিয়ে দাদার কবরের পাশে দাফনও করা হয়।

কিন্তু এর মাত্র দুই-তিন দিন পরেই ফেইসবুকের একটি পোস্ট বদলে দেয় সব কিছু। যে ছেলেকে তারা কফিনবন্দী করে মাটিচাপা দিয়েছিলেন, সেই রিফাত তখনো জীবিত—মাথার খুলিতে বুলেট নিয়ে রাজধানীর একটি হাসপাতালের বেডে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছিলেন! প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই রূপকথার হার মানানো মর্মান্তিক এক সত্য ঘটনা।

ফেসবুকের পোস্টে মিলল বেঁচে থাকা রিফাতের সন্ধান দাফন সম্পন্ন করার কয়েক দিন পর রিফাতের পরিবারের এক সদস্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ছবি দেখতে পান। সেখানে দেখা যায়, মো. রাকিব নামের এক অজ্ঞাতপরিচয় তরুণ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, যার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছিল না। সেই ছবির সঙ্গে রিফাতের চেহারার হুবহু মিল খুঁজে পান তারা।

তৎক্ষণাৎ হাসপাতালে গিয়ে পরিবার দেখতে পায়, সে অন্য কেউ নয়—তাদেরই আদরের রিফাত। চিকিৎসকরা জানান, রিফাতের মাথার পেছনের দিক দিয়ে বুলেট ঢুকে কপালের পাশে আটকে আছে। অবর্ণনীয় যন্ত্রণায় তখনো সে অচেতনপ্রায়। অনেক হাসপাতাল ঘুরে অবশেষে রাজধানীর কাকরাইলে ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতালে সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে রিফাতের মাথা থেকে সেই বুলেট অপসারণ করা হয়। দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে ১৩ সেপ্টেম্বর তাকে আশুলিয়ার বাইপাইলের পলাশবাড়ীর একটি ভাড়াবাসায় ফিরিয়ে আনা হয়।

স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলা রিফাত ও মায়ের আকুলতা বাইপাইলের এক রুমের সেই ভাড়াবাসায় রিফাত এখন বালিশে হেলান দিয়ে দিন কাটান। গুলিবিদ্ধ হওয়ার কারণে তার ডান হাত ও ডান পা ঠিকমতো কাজ করে না। সবচেয়ে বড় কষ্ট হলো, মস্তিষ্কে মারাত্মক আঘাত পাওয়ার কারণে তিনি এখন নিজের বাবা-মাকেও চিনতে পারেন না। মা যখন কাছে গিয়ে বলেন, "বাবা রিফাত, আমি তোমার আম্মা," তখন রিফাত শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেন, "আমার কি জানি লাগে... তবে আপনি আমাকে আপনার ছেলেই মনে করুন।"

ছেলের এমন নির্বাক চাহনি আর স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলার বেদনা মা-বাবাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। তবে চিকিৎসকরা আশা প্রকাশ করেছেন যে, নিয়মিত স্পিচ থেরাপি ও মেমোরি ইনপুট দেওয়ার মাধ্যমে রিফাতকে ধীরে ধীরে সুস্থ করে তোলা সম্ভব।

উপসংহার যাকে নিজের হাতে কবর দিয়েছিলেন বাবা-মা, অলৌকিক উপায়ে সেই সন্তানকে আবার ফিরে পাওয়া পৃথিবীর যেকোনো পিতা-মাতার কাছে পরম পাওয়া। তবে রিফাতের এই বেঁচে থাকা কেবল আনন্দের নয়, এটি জুলাই অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্মমতার এক চিরস্থায়ী ক্ষতচিহ্ন। রিফাত যেন সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেন, এখন সেটাই তার শোকাহত পরিবার ও দেশবাসীর একমাত্র প্রার্থনা।


Comments (0)

Login to leave a comment.

No comments yet. Be the first to comment.


Related posts