‘আমার ছেলেরে মারলো ক্যান?’: পেটে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঝরে গেল ১০ বছরের শিশু হোসেনের তাজা প্রাণ
ঢাকা / নারায়ণগঞ্জ — অভাবের সংসারে একটু সচ্ছলতা আনতে আর মা-বাবার কষ্টের লাঘব করতে সে বেছে নিয়েছিল ছোট্ট একটি পথ। বয়স সবেমাত্র ১০ বছর। এই বয়সে হাতে খাতা-কলম থাকার কথা থাকলেও সে মাথায় চিপস, চকলেট আর আইসক্রিম নিয়ে ঘুরে বেড়াত ফেরি করে। কিন্তু ২০ জুলাই ২০২৪ সালের এক দুপুরে চিটাগাং রোড এলাকার সংঘাতের মাঝে পড়ে একটি অন্ধ বুলেট চিরতরে কেড়ে নিল ছোট্ট হোসেনের প্রাণ।
দুপুরবেলা ঘর থেকে বের হওয়া এবং আর ফিরে না আসা হোসেনের পরিবার নারায়ণগঞ্জের চিটাগাং রোড এলাকার মুক্তিনগরে একটি ভাড়াবাসায় বাস করত। তার বাবা মানিক মিয়া ও মা মালেকা দম্পতির বড় সন্তান ছিল হোসেন। তার দুই ছোট বোন রয়েছে। অভাবের তাড়নায় বাবা-মায়ের হাতে হাত রেখে সাহায্য করতে সে আইসক্রিম ও চকলেট ফেরি করত।
২০ জুলাই দুপুরে ভাত খেয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিল হোসেন। কিন্তু তারপর আর সে মায়ের কোলে ফিরে আসেনি। ওই দিন দুপুরবেলা চিটাগাং রোড এলাকায় পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে তীব্র ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, ককটেল বিস্ফোরণ এবং মুহুর্মুহু গুলি চলছিল। সেই সংঘর্ষের মাঝেই গুলিবিদ্ধ হয় শিশু হোসেন। তার তলপেট ছেদ করে বেরিয়ে যায় একটি তাজা বুলেট।
ঢাকা মেডিকেল থেকে মর্গের লাশ খোঁজা—এক অভাগা বাবার সন্ধান বিকেল সাড়ে পাঁচটার পর থেকে ১০ বছরের হোসেনের কোনো খোঁজ না পেয়ে তার বাবা মানিক মিয়া আশপাশে খুঁজতে শুরু করেন। কিন্তু কোথাও তার হদিস মেলেনি। রাত নটার দিকে অন্য একজনের মুঠোফোনে হোসেনের রক্তাক্ত ও আহত অবস্থার ছবি দেখতে পান তার বাবা-মা। তারা তৎক্ষণাৎ পিকআপ ও রিকশায় চড়ে গভীর রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছান।
হাসপাতালের ইমার্জেন্সি ও বিভিন্ন ওয়ার্ডে খোঁজাখুঁজি করে হোসেনকে না পেয়ে তারা দিশেহারা হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে মধ্যরাতে হাসপাতালের একটি নির্দিষ্ট ঘরে সারি সারি মরদেহের কাছে তাদের নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই অনেকগুলো লাশের ভিড়ে ছোট্ট হোসেনের lifeless দেহ খুঁজে পান তার বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়া বাবা-মা।
পরবর্তীতে ২২ জুলাই রাতে কুমিল্লার হোমনা বা দেবীদ্বারের (বেত্রা গ্রাম) নানাবাড়িতে দাফন করা হয় ছোট্ট হোসেনকে। সন্তানের রক্তাক্ত কাপড় আর ছবি বুকে চেপে বাবা মানিক মিয়া শুধু একটি কথাই বারবার জানতে চেয়েছিলেন—"আমার বাচ্চাটার কী অপরাধ ছিল? কেন আমার বুক খালি হলো?"
উপসংহার জুলাই আন্দোলনের দিনগুলোতে রাজপথে চলা অন্ধ ও বেপরোয়া গুলিবর্ষণে কেবল শিক্ষার্থী বা রাজনৈতিক কর্মীরাই প্রাণ হারাননি, বরং হোসেনের মতো আইসক্রিম ফেরিওয়ালা ১০ বছরের এক নিষ্পাপ শিশুর রক্তেও ভিজেছিল রাজপথ। হোসেনের এই অকালমৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয় রাষ্ট্রযন্ত্রের সেই অন্ধ সহিংসতার ক্ষতচিহ্ন, যা কোনোদিন মুছে যাওয়ার নয়।
Comments (0)
Login to leave a comment.
No comments yet. Be the first to comment.
Related posts
জুলাই ৩৬
‘হেলমেটধারীরা গুলি করে বাবাকে মারে’: রায়েরবাগের রাজপথে হেলমেট ও চাপাতি হাতে সেই তান্ডব মাথায় গুলি ও কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত’
জুলাই ৩৬
‘স্বাধীনতা কী, তা বোঝার বয়স ছিল না’: ৫ আগস্টের বিজয়োল্লাসে বুলেটের আঘাতে নিভে যাওয়া ৬ বছরের জাবিরের জীবন প্রদীপ
জুলাই ৩৬