সুনামগঞ্জের গ্যারেজে লুকিয়ে থাকা যুবকের পায়ে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে গুলি চালায় যে পুলিশ কর্মকর্তারা
সুনামগঞ্জ — "আমার ছেলেরে এইভাবে বন্দুক লাগাইয়া পাটা নষ্ট করে ফেলাইছে! আমি এটার সুস্থ বিচার চাই..." হাসপাতালের মেঝেতে বসে কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন পৈশাচিক পুলিশি বর্বরতার শিকার রিপনের মা।
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট। শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে উত্তাল ছিল পুরো দেশ। সেই আন্দোলনের ঢেউ লেগেছিল সুনামগঞ্জ জেলা সদরের রাজপথেও। শান্তিপূর্ণ সেই আন্দোলন দমন করতে সেদিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু অতি উৎসাহী সদস্য যে কতটা নিষ্ঠুর রূপ ধারণ করেছিল, তার এক জীবন্ত দলিল হয়ে আছে রিপনের ওপর চালানো বর্বরোচিত হামলা। ঘটনার সেই ভিডিও নেট দুনিয়ায় ভাইরাল হওয়ার পর দেশজুড়ে শুরু হয়েছিল তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড়।
গ্যারেজে লুকিয়ে থাকা রিপনকে খুঁজে বের করে পৈশাচিকতা ৪ আগস্ট সুনামগঞ্জের রাজপথে ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে পুলিশের নির্বিচার গুলিবর্ষণ, টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পুলিশের ধাওয়া খেয়ে জীবন বাঁচাতে একপর্যায়ে পার্শ্ববর্তী একটি বাড়ির গ্যারেজে গিয়ে আশ্রয় নেন রিপন।
কিন্তু ঘাতক পুলিশ সদস্যরা তাকে সেখানেও ছাড়েনি। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন এএসপি রাজন কুমার দাসের নির্দেশে সুনামগঞ্জ সদর থানার তৎকালীন ওসি খালেদ চৌধুরী সরাসরি রিপনের পায়ের কাছে বন্দুক ঠেকিয়ে অত্যন্ত কাছ থেকে গুলি চালান। মুহূর্তেই চূর্ণ-বিচূর্ণ ও ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় রিপনের একটি পা।
পচন ধরা পা নিয়ে হাসপাতালের মেঝেতে আর্তনাদ তীব্র যন্ত্রণা আর ক্ষতবিক্ষত পা নিয়ে রিপন বর্তমানে হাসপাতালের বিছানায় কিংবা মেঝেতে দিন কাটাচ্ছেন। কিন্তু সঠিক চিকিৎসা ও অবহেলার কারণে তার সেই ক্ষতস্থানে ইতিমধ্যেই পচন ধরতে শুরু করেছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার পা টিকিয়ে রাখা নিয়ে এখন মারাত্মক শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
হাসপাতালে শুয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে রিপন জানান, "চার তারিখ পুলিশে বন্দুক লাগাইয়া উরুর মাঝে আমারে গুলি করছে। আমি এর বিচার চাই।" তার অসহায় মায়ের আর্তনাদ আর সন্তানের পঙ্গুত্ব বরণের উপক্রম দেখে আশপাশের মানুষেরও চোখ ভিজে ওঠে।
পুলিশ প্রশাসনের বক্তব্য ও বিচার দাবি ঘটনার পর পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর সরাসরি গুলি চালানোর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নির্দেশ ছিল না। মাঠপর্যায়ে কোনো কর্মকর্তা নিজ দায়িত্বে এমন অপরাধ করে থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল।
৫ আগস্টের পর ক্ষমতার পালাবদল ঘটলে সেই অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তারা আত্মগোপনে চলে যান। তবে ছাত্র-জনতার রক্তে ভেজা রাজপথে এ ধরনের পৈশাচিক নির্যাতন চালানো খুনি ও নির্দেশদাতা পুলিশ কর্মকর্তাদের দ্রুত খুঁজে বের করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে সচেতন দেশবাসী।
Comments (0)
Login to leave a comment.
No comments yet. Be the first to comment.
Related posts
জুলাই ৩৬
বন্ধুকে বাঁচাতে গিয়ে নিজে গুলি খেলেন রাফি: ৫ আগস্টের বিজয় মিছিলে তারুণ্যের নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের এক অনন্য উপাখ্যান
জুলাই ৩৬
আধা সামরিক বাহিনী ব্যবহার করে দমনপীড়ন এবং কমান্ড রেসপন্সিবিলিটির বিতর্ক
জুলাই ৩৬