নিরপরাধ ১৬ বছরের কিশোরের ১৩ দিনের বন্দিজীবন: রংপুরে পুলিশের চরম গাফিলতি ও এক বোনের সাহসী প্রতিবাদ
রংপুর — ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই। কোটা সংস্কার আন্দোলনে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পুলিশের গুলিতে নিহত হন রংপুরের বীর সন্তান আবু সাঈদ। তার বুক পেতে দেওয়া সাহসিকতা এবং পুলিশের নির্মম গুলি পুরো বিশ্বকে নাড়িয়ে দেয়। কিন্তু সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিটি ঘটে এর পরদিন, যখন প্রকৃত খুনিদের আড়াল করে অজ্ঞাত দুই থেকে তিন হাজার জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়। আর সেই মামলার শিকার হয়ে আবু সাঈদের ‘খুনি’ হিসেবে কারাগারে পাঠানো হয় ১৬ বছরের এক নিরপরাধ কিশোর আলফি শাহরিয়ার মাহিমকে।
রংপুর পুলিশ লাইন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র মাহিমকে টানা ১৩ দিন কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটানোর পর অবশেষে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
যেভাবে আটক হলো মাহিম ঘটনার সূত্রপাত ১৮ জুলাই। ওই দিন বিকেলে রংপুর নগরীর চকবাজার এলাকার বাসিন্দা শাহজালালের ছোট ছেলে মাহিম বন্ধুদের সাথে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে গিয়েছিল। সেখানে পুলিশের টিয়ারশেলের ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে সে পড়ে যায়। সেখান থেকেই পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে যায়। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, গ্রেপ্তারের পর পুলিশ তার প্রকৃত বয়স ১৬ গোপন করে তাকে ১৯ বছর বয়স্ক দেখিয়ে সরাসরি আবু সাঈদ হত্যা মামলার আসামি হিসেবে কারাগারে পাঠায়।
বোনের সাহসী ফেসবুক স্ট্যাটাস ও নাগরিক ক্ষোভ ছেলেকে খুঁজে না পেয়ে ১৪ দিন ধরে দিশেহারা ছিলেন মাহিমের মা-বাবা। এদিকে আদালত থেকে নথিপত্র তুলে পরিবারের সদস্যরা যখন দেখেন যে মাহিমকে খোদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার আসামি করা হয়েছে, তখন ৩১ জুলাই ফেসবুকে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন মাহিমের বোন ও অনার্সপড়ুয়া শিক্ষার্থী সানজানা আক্তার।
তিনি লেখেন, "যে ছেলেটা লিগ্যাল ডকুমেন্টস অনুযায়ী শিশু, তাকে কীভাবে একটি মিথ্যা মামলায় কারাগারে পাঠানো হলো? এর কি ন্যায়বিচার নেই?" তার এই স্ট্যাটাস মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। মাত্র ২০ ঘণ্টায় ১৩০০ এর বেশি নাগরিক তীব্র নিন্দা জানান এবং সাড়ে সাত হাজারেরও বেশি মানুষ এটি শেয়ার করেন। সুশীল সমাজ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের প্রবল ক্ষোভের মুখে চাপে পড়ে যায় পুলিশ প্রশাসন।
পুলিশের গাফিলতি ও সাফাই বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় শুরু হলে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ নড়েচড়ে বসে। এ বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তাজহাট থানায় আক্রমণের সময় মাহিমকে আটক করা হয়েছিল। সে সময় তার প্রকৃত বয়স জানা সম্ভব হয়নি। পুলিশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরে দ্রুত মাহিমের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে এবং বিষয়টি আদালতের নজরে আনে।
অন্যদিকে সুশীল সমাজ ও আইন বিশেষজ্ঞরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "যে দেশে অধিকারের কথা বললে নির্বিচারে গুলি করে মানুষ হত্যা করা হয়, সে দেশে সবই সম্ভব। আবু সাঈদ নিহত হওয়ার ভিডিও দেশে-বিদেশে সবাই দেখেছে। প্রকৃত খুনিকে বাঁচাতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর এই মামলার দায় চাপানো হচ্ছে।"
অবশেষে কারামুক্ত মাহিম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চাপ এবং পুলিশের হস্তক্ষেপে অবশেষে আদালতের নজরে আনা হয় বিষয়টি। প্রথমে ৪ আগস্ট মাহিমের জামিন শুনানির দিন ধার্য থাকলেও, মাহিম শিশু হওয়ায় এবং ঘটনাটি ব্যাপকভাবে আলোচিত হওয়ার পর আদালত তাকে ১ আগস্টই আগাম জামিন দিয়ে মুক্তি দেন। ১৩ দিনের বিভীষিকা শেষে মাহিম অবশেষে তার পরিবারের কাছে ফিরে যায়।
উপসংহার ১৬ বছরের এক কিশোরকে বয়স বাড়িয়ে হত্যা মামলায় ফাঁসানোর এই ঘটনা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চরম স্বেচ্ছাচারিতা ও গাফিলতির এক জ্বলন্ত প্রমাণ। আবু সাঈদ যেমন তার জীবন দিয়ে বাংলাদেশের তারুণ্যকে জাগিয়ে তুলেছিলেন, তেমনি মাহিমের ঘটনাটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় কীভাবে রাষ্ট্রযন্ত্র প্রকৃত খুনিদের বাঁচাতে সাধারণ মানুষকে বলির পাঁঠা বানায়।
Comments (0)
Login to leave a comment.
No comments yet. Be the first to comment.
Related posts
জুলাই ৩৬
আধা সামরিক বাহিনী ব্যবহার করে দমনপীড়ন এবং কমান্ড রেসপন্সিবিলিটির বিতর্ক
জুলাই ৩৬
‘মৃত ভেবে লাশের স্তূপে ফেলে যায় পুলিশ’: শরীরে ১৫০ ছররা গুলি নিয়ে মাসুমের বেঁচে ফেরার রোমহর্ষক গল্প
জুলাই ৩৬