36July
জুলাই ৩৬

‘মৃত ভেবে লাশের স্তূপে ফেলে যায় পুলিশ’: শরীরে ১৫০ ছররা গুলি নিয়ে মাসুমের বেঁচে ফেরার রোমহর্ষক গল্প

by Ataullah Rahman Polas · · 19 views
‘মৃত ভেবে লাশের স্তূপে ফেলে যায় পুলিশ’: শরীরে ১৫০ ছররা গুলি নিয়ে মাসুমের বেঁচে ফেরার রোমহর্ষক গল্প

ঢাকা — ৫ আগস্ট, ২০২৪। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরশাসকের পতনের খবর ছড়িয়ে পড়তেই পুরো দেশ যখন বিজয়োল্লাসে মেতে উঠেছিল, ঠিক সেই সন্ধ্যায় বাড্ডার রাস্তায় রচিত হচ্ছিল আরেক নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। ৫ আগস্টের সেই বিজয়োল্লাসের দিনটিকে দ্বিতীয় জীবন পাওয়ার দিন হিসেবেই দেখেন মাসুম মিয়া। কারণ সেদিন মৃত ভেবে তাকে লাশের স্তূপে ফেলে গিয়েছিল পুলিশ।

শরীরে প্রায় ১৫০টি ছররা গুলির ক্ষত আর লাশের স্তূপ থেকে ফিরে আসার সেই দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকা মাসুমের গল্পটি অন্য যেকোনো অভিজ্ঞতার চেয়ে আলাদা ও ভয়ংকর।


বিজয় মিছিলে অতর্কিত গুলি ও কালিমা পড়ে মৃত্যুর অপেক্ষা যমুনা টিভির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ৫ আগস্ট সন্ধ্যায় রাজধানীর বাড্ডা এলাকায় বিজয় মিছিলে বের হয়েছিলেন মাসুম মিয়া। কিন্তু হুট করেই সেই মিছিলে ছুটে আসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এলোপাতাড়ি গুলি।

মুহূর্তের মধ্যেই প্রায় ১৫০টি ছররা গুলি (শটগানের স্প্লিন্টার) বিদ্ধ হয় মাসুমের শরীরে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও যন্ত্রণায় একপর্যায়ে তিনি মৃত্যুর প্রহর গুনতে শুরু করেন। মাসুম বলেন, "আমি কালিমা পড়ছিলাম যে মারা যাব।" এরপরই তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।


লাশের স্তূপ ও বুট জুতার লাথি জ্ঞান ফেরার পর মাসুম নিজেকে আবিষ্কার করেন এক অবর্ণনীয় বিভীষিকার মধ্যে। পুলিশ তাকে মৃত ভেবে অন্যান্য ডেডবডির সাথে একটি লাশের স্তূপে ফেলে রেখেছিল।

রোমহর্ষক সেই মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে মাসুম বলেন, "উনারা (পুলিশ) বুট জুতা দিয়ে লাথি দিচ্ছিল। লাথি দিয়ে দিয়ে দেখতেছিল কারা নড়াচড়া করতেছে না। যারা নড়াচড়া করছে না, তাদের ডেডবডি ভেবে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। তখন আমার গায়েও লাথি লাগে, আর আমার জ্ঞান ফেরে।"


শর্টগান ঠেকিয়ে পুলিশের নির্মম খেলা জ্ঞান ফেরার পর মাসুম দেখতে পান আরেক পৈশাচিক দৃশ্য। চারজন আহত মানুষের মাথায় শর্টগান ঠেকিয়ে রেখেছে পুলিশ। বাঁচার আকুতি জানিয়ে একজন পুলিশের কাছে প্রাণভিক্ষা চান। তিনি বলেন, "স্যার পালাইতে দেন, পালায় যাই।"

পুলিশ তাকে দৌড়ে পালাতে বলে, কিন্তু যখনই তিনি দৌড় দেন, তখন পেছন থেকে শর্টগান দিয়ে তাকে সজোরে আঘাত করা হয়। মাসুম জানান, "সবাইকে একটা একটা এত জোরে বাড়ি দিছে যে হাড়গোড় ভেঙে দেওয়ার মতো অবস্থা। যদি দৌড়ে পালাতে বলবেনই, তাহলে আবার কেন শর্টগান দিয়ে এভাবে মারতে হবে?" সৌভাগ্যক্রমে, অন্য আহতদের সহায়তায় মাসুম সেই মৃত্যুকূপ থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন।


আজীবন সঙ্গী বুলেটের ক্ষত মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে এলেও মাসুমের শরীর থেকে সব গুলি বের করা সম্ভব হয়নি। অসংখ্য স্প্লিন্টার আজীবন সঙ্গী হয়ে থাকবে তার। তবে নিজের যন্ত্রণার চেয়েও মাসুমকে বেশি কাঁদায় তার চোখের সামনে মারা যাওয়া সহযোদ্ধারা।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে মাসুম বলেন, "বেঁচে আছি আলহামদুলিল্লাহ, কিন্তু ভাইদের জন্য অনেক কষ্ট হয়। তাদের জন্য কিছু করতে পারি নাই, তারা ওই জায়গাতেই মারা গেছে। ওই স্মৃতিগুলো মনে করলেই কান্না আসে।"


উপসংহার ২৪-এর ৫ আগস্ট শুধু বিজয়ের দিন নয়, মাসুমের মতো হাজারো তরুণের রক্ত আর আজীবনের পঙ্গুত্বের বিনিময়ে কেনা এক স্বাধীনতার দিন। লাশের স্তূপ থেকে ফিরে আসা মাসুমের এই জবানবন্দি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বিজয়ের ঠিক আগমুহূর্তেও রাষ্ট্রযন্ত্র কতটা হিংস্র ও নির্মম রূপ ধারণ করেছিল।


Comments (0)

Login to leave a comment.

No comments yet. Be the first to comment.


Related posts