মেরাদিয়ায় নির্মাণাধীন ভবনের বারান্দায় ঝুলন্ত আমিরের ওপর পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জের সেই পৈশাচিক নির্যাতন
ঢাকা — "পুলিশ বলতেছিল চারতলা থেকে নিচে ঝাঁপ দেওয়ার জন্য! আমি ঝাঁপ না দিয়ে ছাদের রড ধরে ঝুলে ছিলাম। কিন্তু ওরা ওপর থেকে গুলি করতে থাকল..."
কথাগুলো বলছিলেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পুলিশের নৃশংস পৈশাচিকতার শিকার দিনমজুর আমির হোসেন। মেরাদিয়ায় একটি নির্মাণাধীন ভবনের চারতলার ছাদ থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় এক যুবকের ওপর পুলিশের পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে গুলি চালানোর যে শিউরে ওঠার মতো ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল, তিনি আর কেউ নন—এই আমির হোসেন। শরীরে ছয়টি তাজা বুলেট বয়ে বেড়ানো আমির অলৌকিকভাবে বেঁচে থাকলেও যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন হাসপাতালের বিছানায়।
মেরাদিয়ার সেই নির্মাণাধীন ভবন ও পুলিশি বর্বরতা চ্যানেল ২৪-এর বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, জুলাই আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে মেরাদিয়া এলাকায় ছাত্র-জনতার আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধাওয়ায় অন্যান্যদের মতো আমির হোসেনও আশ্রয় নেন একটি নির্মাণাধীন ভবনে।
কিন্তু ঘাতক পুলিশ সদস্যরা তাকে সেখানেও খুঁজে বের করে। চারতলার বারান্দায় বা ছাদের কিনারায় যখন আমির আটকে পড়েন, তখন পুলিশ তাকে নিচে ঝাঁপ দিতে বাধ্য করার চেষ্টা করে। কিন্তু তিনি জীবন বাঁচাতে রড বা কার্নিশ ধরে ঝুলে থাকেন। ঠিক সেই মুহূর্তে ওপর ও নিচ থেকে পুলিশ সদস্যরা তাকে লক্ষ্য করে উপর্যুপরি গুলি চালাতে শুরু করে।
শরীরে ছয়টি বুলেট ও মৃত্যুর মুখোমুখি সেই মুহূর্তটি ভিডিওতে দেখা যাওয়া সেই লোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আমির জানান, পুলিশের ছোড়া একটি-দুটি নয়, মোট ছয়টি তাজা বুলেট তার পায়ে ও শরীরে গিয়ে আঘাত করে। তিনতলার দিক থেকে এক পুলিশ সদস্য তাকে লক্ষ্য করে খুব কাছ থেকে গুলি ছোড়ে। একে একে ছয়টি গুলি লাগার পর তার পা আর নড়াচড়া করার শক্তি ছিল না। শরীর থেকে তখন শুধু রক্ত ঝরছে। তিনি ভেবেছিলেন সেদিন আর তিনি বেঁচে ফিরতে পারবেন না। গুলিবিদ্ধ হয়ে ঝুলে থাকার সেই মুহূর্তটির কথা মনে পড়লে আজও শিউরে ওঠেন তিনি।
পরিবারের কষ্ট ও শিক্ষার্থীদের সহযোগিতার হাত মেরাদিয়ার এক জীর্ণ কুটিরে ভাই-বোনদের নিয়ে বাস করা দিনমজুর আমির হোসেনের আয়েই চলত সংসার। কিন্তু শরীরের এই মারাত্মক ক্ষত এবং অস্ত্রোপচারের পর তার পক্ষে আর আগের মতো কাজ করা সম্ভব নয়। ভবিষ্যতে পরিবার কীভাবে চলবে বা চিকিৎসার খরচ কীভাবে উঠবে, তা নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তার। তবে এই অসহায় মানুষটির পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন ইস্ট ওয়েস্ট, ব্র্যাক ও ইম্পেরিয়ালসহ আশপাশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা। তারা নিয়মিত আমিরের খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং সাধ্যমতো সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।
আমিরের একটাই দাবি—যাঁরা তাকে এভাবে পশুর মতো গুলি করেছেন এবং যাঁরা পুলিশকে সাধারণ মানুষের ওপর এমন নির্মমতা চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন, তাদের প্রত্যেককে দ্রুত আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত বিচার করা হোক।
উপসংহার আমির হোসেনের এই রক্তাক্ত শরীর ও বেঁচে থাকার আকুতি জুলাই অভ্যুত্থানের ইতিহাস এবং পুলিশের বর্বরতার এক মূর্ত প্রতীক। দিনমজুর আমিরের শরীরে বিদ্ধ প্রতিটি বুলেট কেবল তার নিজের নয়, এটি স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থার নিষ্ঠুরতার এক চিরস্থায়ী ক্ষতচিহ্ন হয়ে থাকবে।
Comments (0)
Login to leave a comment.
No comments yet. Be the first to comment.
Related posts
জুলাই ৩৬
‘আমার ছেলেরে মারলো ক্যান?’: পেটে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঝরে গেল ১০ বছরের শিশু হোসেনের তাজা প্রাণ
জুলাই ৩৬
‘হেলমেটধারীরা গুলি করে বাবাকে মারে’: রায়েরবাগের রাজপথে হেলমেট ও চাপাতি হাতে সেই তান্ডব মাথায় গুলি ও কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত’
জুলাই ৩৬