36July
জুলাই ৩৬

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর: কেমন আছেন নেপথ্যের সাহসীরা, কতটা পূরণ হলো নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন?

by Ataullah Rahman Polas · · 39 views
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর: কেমন আছেন নেপথ্যের সাহসীরা, কতটা পূরণ হলো নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন?

ঢাকা — ২৪-এর জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। বুলেটের সামনে বুক চিতিয়ে দেওয়া আবু সাঈদের মহাকাব্যিক আত্মত্যাগ, পুলিশের ভ্যানের সামনে সুপারম্যানের মতো দাঁড়িয়ে থাকা তরুণী নুসরাত কিংবা ঢালহীন হাতে এক টুকরো টিন নিয়ে বৃষ্টির মতো ছররা গুলি ঠেকানো নাসির—এমন অসংখ্য অজানা বীরত্ব আর ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে পতন ঘটেছিল এক প্রবল পরাক্রমশালী স্বৈরাচারের। আজ সেই রক্তক্ষয়ী জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু যাদের আত্মত্যাগে এই নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন রচিত হয়েছিল, তারা আজ কেমন আছেন? তাদের চোখে এই দুই বছরে কতটা পূরণ হয়েছে সেই স্বপ্ন?


নেপথ্যের সাহসীদের আক্ষেপ ও স্বীকৃতিহীনতার গল্প টিনের টুকরো হাতে পুলিশের গুলির সামনে দাঁড়িয়ে পুরো দেশের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেওয়া নাসির আজও ভোলেননি সেই দিনটির কথা। তিনি জানান, পুলিশের ছররা গুলি যখন বৃষ্টির মতো টিনের ওপর পড়ছিল, তখন তার হাতে-কপালে গুলি বিদ্ধ হয়। তার সেই দুঃসাহসী ছবি পুরো বিশ্ব দেখলেও, দুই বছর পর তার কোনো আক্ষেপ বা অভিযোগ নেই। তবে তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, "আমার বিষয়টা বিশ্বের অনেকেই দেখছে, কিন্তু এই ছেলেটা বেঁচে আছে না মারা গেছে, দিনশেষে তার খোঁজ কেউ নেয়নি।"

অন্যদিকে, পুলিশের ভ্যানের সামনে দাঁড়িয়ে সাহস জোগানো 'অগ্নিকন্যা' নুসরাতও বর্তমানে রাজনীতি ও ক্ষমতার বলয় থেকে সম্পূর্ণ দূরে আছেন। তিনি মনে করেন, মাত্র দুই বছরের মধ্যেই যেন জুলাইয়ের ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, "গত বছর দিনগুলো সুন্দরভাবে পালন করা হলেও, এই বছর তেমন কিছু হয়নি। এটাকে হয়তো কালচারাল ফ্যাসিজম বলে, ইতিহাস থেকে সব মুছে দেওয়ার চেষ্টা। এমন হলে ভবিষ্যতে কেউ আর এই স্মৃতি ধারণ করবে না।"


নারীদের অবদান এবং বর্তমানের হতাশা এই আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল অসামান্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দোতলা বাসের পেছনে আটকে পড়া এবং ছাত্রলীগের নারকীয় হামলার শিকার হওয়া এক নারী শিক্ষার্থী সেই দিনের রোমহর্ষক স্মৃতির কথা জানান। মুখের ওপর ইট পড়ে রক্তাক্ত হওয়া এবং ছয়টি সেলাই নেওয়ার সেই মানসিক ট্রমা তিনি আজও কাটিয়ে উঠতে পারেননি।

সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, আন্দোলনে সোচ্চার হওয়া নারীরা দুই বছর পরও তীব্র অনলাইন হ্যারাসমেন্টের (হয়রানির) শিকার হচ্ছেন। অনেকেই এই হয়রানি সহ্য করতে না পেরে সরে গেছেন। তিনি বলেন, "আমি এখনো নিজেকে নিরাপদ মনে করি না। যেভাবেই চলি না কেন, আমি সেফ ফিল করি না।"


নতুন বাংলাদেশ: স্বপ্ন বনাম বাস্তবতা আন্দোলনের অন্যতম দাবি ছিল বাকস্বাধীনতা এবং রাষ্ট্র সংস্কার। কিন্তু দুই বছর পর সাধারণ মানুষের মতে, বাকস্বাধীনতা কিছুটা অর্জিত হলেও সংস্কারের আসল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়েছে। একজন আন্দোলনকারী বলেন, "আগে কিছু বললেই জেলে পাঠিয়ে দিত, এখন অন্তত মানুষ কথা বলতে পারছে। কিন্তু আমরা শুধু বাকস্বাধীনতা চাইনি, রাষ্ট্র সংস্কারও চেয়েছিলাম। সেই সংস্কারের আশা আমি এখন ছেড়ে দিয়েছি।"

যেই রিকশাচালকরা সেদিন ছাত্রদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, ভাড়া নেননি এবং অ্যাম্বুলেন্সের মতো সেবা দিয়েছিলেন, আজ তারাই আবার নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। অনেকেই মনে করেন, চাঁদাবাজির রদবদল হয়নি, শুধু দলের নাম পাল্টেছে।

উপসংহার দুই বছর পেরিয়ে এসে জুলাইয়ের এই সংগ্রামীদের চাওয়া একটাই—একটি বৈষম্যহীন ও উন্নত বাংলাদেশ। যেখানে সবাই নির্ভয়ে কথা বলতে পারবে, চাঁদাবাজি থাকবে না এবং দেশের উন্নতিই হবে প্রধান লক্ষ্য। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের জানা-অজানা বীরত্বগাথাগুলো যেন হারিয়ে না যায় এবং অপরাধীরা যেন সঠিক বিচার পায়, সেটিই আজ আপামর জনতার একমাত্র দাবি।


Comments (0)

Login to leave a comment.

No comments yet. Be the first to comment.


Related posts