36July
জুলাই ৩৬

গণভবনের গোপন নথিতে ভয়াবহ সত্য: কোথায় কার গায়ে গুলি লেগেছে, প্রতিটি লাশের হিসাব রাখতেন শেখ হাসিনা!

by Ataullah Rahman Polas · · 28 views
গণভবনের গোপন নথিতে ভয়াবহ সত্য: কোথায় কার গায়ে গুলি লেগেছে, প্রতিটি লাশের হিসাব রাখতেন শেখ হাসিনা!

ঢাকা — জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী দিনগুলোতে যখন চারদিকে বারুদের গন্ধ আর লাশের মিছিল, তখন সাধারণ মানুষের মনে একটি প্রশ্ন প্রায়ই উঁকি দিত—গণভবনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কি সত্যিই জানেন রাজপথে কত তাজা প্রাণ ঝরে যাচ্ছে? নাকি তাকে ভুল তথ্য দিয়ে অন্ধকারে রাখা হয়েছে? ৫ আগস্ট গণভবনের পতনের পর ধ্বংসস্তূপ থেকে বেরিয়ে আসা কিছু ধুলোমাখা গোপন নথি উন্মোচন করেছে এক হাড়হিম করা সত্য। শেখ হাসিনা অন্ধ ছিলেন না, বরং মাঠপর্যায়ের প্রতিটি লাশের নিখুঁত হিসাব তার টেবিলে পৌঁছে যেত।


লাশের বিবরণী ও রাজনৈতিক পরিচয়ের তালিকা ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন ও উদ্ধার হওয়া নথি থেকে জানা যায়, ১৬ থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত দেশজুড়ে নিহত ১৩৬ জনের একটি বিস্তারিত তালিকা শেখ হাসিনার কাছে জমা দেওয়া হয়েছিল। সে সময় সংবাদমাধ্যমের হিসাবে নিহতের সংখ্যা ছিল ১৪৬; অর্থাৎ গোয়েন্দাদের দেওয়া তথ্য বাস্তবের একদম কাছাকাছি ছিল।


চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, সেই তালিকায় শুধু নিহতের সংখ্যা ছিল না, বরং ছিল প্রতিটি লাশের এক বীভৎস কাটাছেঁড়া। নিহত ব্যক্তি কোন দলের সমর্থক, তার পরিবার রাজনীতি করে কি না, কোন থানায় কত নম্বর মামলা হয়েছে এবং নিহতের শরীরের ঠিক কোথায় গুলির আঘাত লেগেছে—তার নিখুঁত বিবরণ ছিল। অর্থাৎ, শেখ হাসিনা জানতেন কোন যুবকের পেটে গুলি লেগেছে আর কার মাথার খুলি উড়ে গেছে! কিন্তু এসব জেনে তিনি দমে যাননি, বরং ২২ জুলাই শীর্ষ ব্যবসায়ীদের সাথে বৈঠকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, কাউকে সহজে ছাড় দেওয়া হবে না।


এনটিএমসির নজরদারি ও প্রযুক্তির অপব্যবহার গণভবনের ফাইলে থাকা ‘সরকারি স্থাপনায় নাশকতার সময় আশপাশের এলাকায় মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের সংখ্যা’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের গতিবিধি নজরদারিতে রাখতে রাষ্ট্রের কেনা প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল। ১৮ ও ১৯ জুলাই বিটিভি ভবন ও মেট্রো রেল স্টেশনের আশপাশে মোবাইল ব্যবহারকারীদের ডেনসিটি (ঘনত্ব) ডেটা দেখে সরকার বুঝতে পারত আন্দোলনের জোয়ার কোথায় আছড়ে পড়ছে। আর সেই তথ্যের ভিত্তিতেই চালানো হতো সাঁড়াশি অভিযান। আইএসপি পর্যায়ে যেকোনো কনটেন্ট ব্লক করতে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারকে (এনটিএমসি) আরও শক্তিশালী করার সুপারিশও করা হয়েছিল।


ভারতীয় সিগন্যাল ডাউন ও মিডিয়া ব্ল্যাকআউট ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের সময় দেশের বাইরের দুনিয়াকে সত্য জানানো ঠেকাতে মরিয়া ছিল সরকার। বিটিআরসিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় মোবাইল টাওয়ারের সিগন্যাল কমিয়ে দিতে। সরকারের ভয় ছিল, বর্ডার এলাকার মানুষ ভারতীয় নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বিদেশের সংবাদমাধ্যমে ছবি ও ভিডিও পাঠিয়ে দেবে। এমনকি বিদেশের ফ্লাইটে কেউ মেমোরি কার্ড বা ফ্ল্যাশ ড্রাইভে করে তথ্য পাচার করছে কি না, তা নিয়েও গোয়েন্দারা সজাগ ছিলেন।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম যেমন—বিবিসি, আল জাজিরা, এএফপি এবং নেত্র নিউজের সাথে তথ্য সমন্বয়ের মূল ব্যক্তি হিসেবে আরিফুল ইসলাম আদিবকে (বর্তমানে এবি পার্টির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক) চিহ্নিত করা হয়েছিল এবং তথ্য পাচারকারীদের ‘দুষ্কৃতিকারী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছিল।


আরব আমিরাতের মতো শাস্তির সুপারিশ আন্দোলনকারীদের কঠোরভাবে দমনের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতে বিক্ষোভকারীদের যেভাবে দ্রুত সাজা দেওয়া হয়েছে, বাংলাদেশেও তেমন তাৎক্ষণিক শাস্তির বিধান চালুর সুপারিশ করা হয়েছিল ওই নথিতে। পাশাপাশি, বহিরাগতরা যাতে আবাসিক এলাকায় আশ্রয় নিতে না পারে, সে জন্য আবাসিক এলাকার ভাড়াটিয়াদের ওপর নজরদারি বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়।


সমন্বয়কদের দ্রুত বিচার ও দমনের মাস্টারপ্ল্যান জুলাই আন্দোলনের সময় ডিবি হেফাজতে আটকে রাখা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৬ সমন্বয়ক (নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদসহ) যেন সহজে পার না পায়, সে জন্য তাদের বিরুদ্ধে ‘দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে’ ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল নথিতে। পাশাপাশি, আন্দোলন কঠোরভাবে দমনের জন্য ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আকবর হোসেনকে দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল।

আন্দোলনে অর্থায়নকারীদের (হুন্ডি ব্যবসায়ী) চিহ্নিত করা এবং বিনামূল্যে আন্দোলনকারীদের চিকিৎসা দেওয়ায় উত্তরা ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের ওপর নজরদারির প্রমাণও মেলে এসব নথিতে।


প্রযুক্তির অপব্যবহার ও মিডিয়া ব্ল্যাকআউট ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের সময় দেশের ভেতরের খবর যেন বাইরে না যায়, সে জন্য বিটিআরসিকে সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় মোবাইল টাওয়ারের সিগন্যাল কমিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তথ্য পাচার ঠেকাতে এনটিএমসির মাধ্যমে কঠোর নজরদারি চালানো হয়। মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের ঘনত্ব (ডেনসিটি) বিশ্লেষণ করে আন্দোলনকারীদের জমায়েতের ওপর সাঁড়াশি অভিযান চালানো হতো। এমনকি বিক্ষোভকারীদের দমাতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো তাৎক্ষণিক শাস্তির বিধান চালুরও সুপারিশ করা হয়েছিল।


প্যারানয়া এবং গোপন তদন্ত নথিগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, শেখ হাসিনা নিজের মৃত্যু নিয়ে একপ্রকার ‘প্যারানয়েড’ বা অতিরিক্ত আতঙ্কিত ছিলেন। গণভবনে তার বাসস্থানের প্রতিটি দেয়াল ছিল বুলেটপ্রুফ এবং নিয়মিত তার খাবার পানির রাসায়নিক টেস্ট করানো হতো।

নথিতে আরও দেখা যায়, দলের ভেতরে ও বাইরে সবার ওপরই তিনি নজরদারি চালাতেন। সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ ও ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের বিরুদ্ধে গোপনীয়তার সাথে অভ্যন্তরীণ তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া কোন এমপি-মন্ত্রী পার্টি ফান্ডে কত টাকা দিচ্ছেন (যেমন—সাবেক রেলমন্ত্রী জিল্লুল হাকিম ৫০ লাখ, সাইফুজ্জামান চৌধুরী ১ লাখ ৪২ হাজার) তারও পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব রাখা হতো।


উপসংহার জাতিসংঘের হিসাবে ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ১,৪০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। গণভবনের এই গোপন নথিগুলো প্রমাণ করে, এই বিপুল প্রাণহানির দায় কেবল মাঠপর্যায়ের পুলিশের নয়। ক্ষমতার কেন্দ্রে বসে শেখ হাসিনা প্রতিটি লাশের খবর পড়তেন এবং দমন-পীড়নের আরও কঠোর নির্দেশ দিতেন। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার নেশা তাকে এতটাই অন্ধ করেছিল যে, সমঝোতার পথ না হেঁটে তিনি নিজের নাগরিকদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। গণভবনের ধ্বংসস্তূপ আজ ইতিহাস হয়ে গেলেও, এই নথিগুলো চিরকাল সেই ভয়াবহ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের অকাট্য দলিল হয়ে থাকবে।


Comments (0)

Login to leave a comment.

No comments yet. Be the first to comment.


Related posts