‘ফুটবলার হতে চেয়েছিল সামির, কিন্তু জানালা বন্ধ করতে গিয়ে বুলেট কেড়ে নিল তার প্রাণ’: ১১ বছরের শিশুর নির্মম মৃত্যুর এক বুকফাটা গল্প
ঢাকা — বই, প্লাস্টিকের খেলনা আর ঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা ছোপ ছোপ রক্তের দাগ—১১ বছরের শিশু সামিরের রেখে যাওয়া একমাত্র স্মৃতি বলতে আজ কেবল এইটুকুই। বড় হয়ে সে ফুটবলার হতে চেয়েছিল। কিন্তু ১৯ জুলাই ২০২৪ সালের এক বিকেলে ঘরের জানালা বন্ধ করতে গিয়ে একটি অন্ধ বুলেট চিরতরে নিভিয়ে দিয়েছে তার সব স্বপ্ন।
সময় টিভির বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে মিরপুরের কাফরুলে পুলিশের গুলিতে নিহত ১১ বছরের শিশু সামিরের এই মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক ইতিকথা।
জানলা বন্ধ করতে গিয়ে বুলেটবিদ্ধ সামির ঘটনাটি ঘটে গত ১৯ জুলাই। কোটা সংস্কার আন্দোলন ও পরবর্তী সহিংসতার দিনগুলোতে মিরপুরের কাফরুল থানার ঠিক বিপরীত পাশের একটি ছোট বাসায় পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন সাকিব রহমান। সেদিন কাফরুল থানার সামনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ চলছিল। সংঘর্ষের সময় বাতাসে ছড়িয়ে পড়া কাঁদানে গ্যাসের ঝাঁঝালো ধোঁয়া ঘরে ঢুকতে শুরু করলে ১১ বছরের শিশু সামির এগিয়ে যায় জানলাটি বন্ধ করার জন্য।
ঠিক সেই মুহূর্তেই বাইরে থেকে ছুটে আসা একটি বুলেট জানালা ভেদ করে সরাসরি আঘাত করে সামিরের চোখে। তার চোখ দিয়ে ঢুকে মাথার খুলি ভেদ করে সেই বুলেটটি বেরিয়ে যায় এবং ঘরের দেওয়ালে গিয়ে লাগে। সামিরের ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা তার চাচা মশিউর রহমানের গায়েও সেই বুলেটের আঘাত লাগে। তাৎক্ষণিকভাবে সামিরকে হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
থানায় নিয়ে জোরপূর্বক অভিযোগহীনতার মুচলেকায় স্বাক্ষর সন্তান হারানোর চরম শোকের মধ্যেই সামিরের পরিবারকে মুখোমুখি হতে হয় এক নতুন মানসিক যন্ত্রণার। সামিরের বাবা সাকিবের অভিযোগ, ঘটনার পর তাকে কাফরুল থানায় ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে ডিউটি অফিসারের উপস্থিতিতে একটি প্রিন্ট করা কাগজ তার হাতে দেওয়া হয়, যেখানে লেখা ছিল—তিনি স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে জানাচ্ছিলেন যে ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় তার কোনো অভিযোগ নেই এবং তিনি লাশ দাফনের জন্য নিয়ে যাচ্ছেন। সন্তানের লাশ কাঁধে নেওয়ার আকুলতায় এবং পুলিশের চাপে বাধ্য হয়ে সেই কাগজে স্বাক্ষর দিতে হয়েছিল শোকার্ত পিতাকে।
একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে সামিরের মা ফারিয়া ইবনাত মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। সন্তানকে গ্রামের বাড়ি আশুলিয়ায় দাফন করে তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন। কাফরুলের এই ছোট্ট বাড়িটি এখন সামিরের খেলনা আর তার রঙিন স্বপ্নগুলোর নীরব সাক্ষী হয়ে পড়ে আছে।
এলাকাবাসীর ক্ষোভ ও বিচার দাবি ঘরের ভেতরে থেকেও যদি একটি শিশুকে এভাবে বুলেটের শিকার হতে হয়, তবে সাধারণ মানুষ কোথায় নিরাপদ থাকবে—এই প্রশ্ন আজ সবার মুখে মুখে। এলাকার মানুষ ও প্রতিবেশীরা এই নৃশংস ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষী পুলিশ সদস্যদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। আর কোনো মায়ের বুক যেন এভাবে খালি না হয়, এটাই এখন শোকার্ত বাবা সাকিবের একমাত্র চাওয়া।
Comments (0)
Login to leave a comment.
No comments yet. Be the first to comment.
Related posts
জুলাই ৩৬
‘আমার ছেলেরে মারলো ক্যান?’: পেটে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঝরে গেল ১০ বছরের শিশু হোসেনের তাজা প্রাণ
জুলাই ৩৬
‘হেলমেটধারীরা গুলি করে বাবাকে মারে’: রায়েরবাগের রাজপথে হেলমেট ও চাপাতি হাতে সেই তান্ডব মাথায় গুলি ও কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত’
জুলাই ৩৬