36July
জুলাই ৩৬

ফুল হয়ে ফোটার আগেই ঝরল ওরা: জুলাইয়ের বারুদে প্রাণ হারানো শিশুদের মর্মান্তিক গল্প

by Ataullah Rahman Polas · · 24 views
ফুল হয়ে ফোটার আগেই ঝরল ওরা: জুলাইয়ের বারুদে প্রাণ হারানো শিশুদের মর্মান্তিক গল্প

ঢাকা — ফুলের মতো শিশুগুলো সবে ফুটছিল, কিন্তু ঘাতক বুলেট তাদের বিকশিত হতে দিল না। কুঁড়িতেই ঝরে গেল ছোট্ট জীবনগুলো। ২৪-এর জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী দিনগুলোতে কেবল রাজপথের তরুণরাই প্রাণ দেননি, চার দেয়ালের ভেতরের নিরাপদ আশ্রয়ও রক্ষা করতে পারেনি নিষ্পাপ শিশুদের। বারুদের গন্ধে মুছে গেছে তাদের জীবনের সৌরভ।

কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে চলা কয়েক দিনের সংঘাতে ৪ থেকে ১৬ বছর বয়সী অন্তত ৯ জন শিশু-কিশোরের মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে চারজন মারা গেছে নিজেদের ঘরের ভেতরে, আর বাকিরা প্রাণ হারিয়েছে সড়কে।


বাবার কোলেও নিরাপদ ছিল না রিয়া ও আহাদ ১৯ জুলাই বিকেল। বাবা-মায়ের সাথে নিজ বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাইরের পরিস্থিতি দেখছিল চার বছরের ছোট্ট শিশু আব্দুল আহাদ। হঠাৎ একটি ঘাতক বুলেট তার ডান চোখে বিদ্ধ হয়ে মাথার ভেতরে আটকে যায়। রক্তাক্ত সন্তানকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেলের আইসিইউতে ছুটলেও ২০ জুলাই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে আহাদ।

অন্যদিকে, নারায়ণগঞ্জের নয়ামাটি এলাকায় গোলাগুলি শুরু হলে ছাদে খেলতে থাকা ৬ বছরের রিয়া গোপকে কোলে তুলে নিয়েছিলেন বাবা। কিন্তু বাবার কোলও তাকে বাঁচাতে পারেনি। বাবার কোলেই রিয়ার মাথায় গুলি লাগে এবং ২৫ জুলাই নিভে যায় তার জীবনপ্রদীপ।


ঘরে ঢুকে জমদূত বুলেটের হানা বাইরের টিয়ারশেলের ধোঁয়া যেন ঘরে ঢুকতে না পারে, সেজন্য মিরপুরের কাফরুলে ১১ বছরের শিশু শাফকাত সামির জানালা বন্ধ করতে গিয়েছিল। ঠিক তখনই একটি বুলেট তার চোখ দিয়ে ঢুকে মাথার পেছন দিয়ে বেরিয়ে যায়।

একইভাবে, ১৯ জুলাই রাজধানীর উত্তরায় বাসার চারতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে গিয়ে কিছু বুঝে ওঠার আগেই মাথায় গুলি লেগে লুটিয়ে পড়ে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাইমা।


রাস্তায় লাশের স্তূপ, এমনকি লাশের গায়েও গুলি! রাস্তায় নেমেও রেহাই পায়নি কিশোররা। ১৬ বছরের কিশোর ইফাত যাত্রাবাড়ীতে আহত একজনকে হাসপাতালে নিতে গিয়ে নিজেই পুলিশের বুলেটের শিকার হয়ে মারা যায়।

সবচেয়ে রোমহর্ষক ঘটনাটি ঘটে নরসিংদীতে। ১৮ জুলাই সেখানে পুলিশের গুলিতে নিহত হয় ১৪ বছরের কিশোর তাহমিদ ভূঁইয়া। সহপাঠীরা যখন তাহমিদের লাশ নিয়ে মহাসড়কে বিক্ষোভ মিছিল করছিল, তখন পুলিশ আবারও গুলি চালায়। মৃত্যুর পর সেই লাশের গায়ে আবারও বিদ্ধ হয় পুলিশ ও ঘাতকদের বুলেট !

এছাড়া, কৌতূহলবশত বাইরে গিয়ে চিটাগাং রোডে ১০ বছরের হোসাইন এবং কারওয়ান বাজারে ১৩ বছরের দুরন্ত কিশোর মোবারক হোসেন চিরতরে হারিয়ে যায় বুলেটের আঘাতে। ঢাকা মেডিকেলের লাশের স্তূপে তাদের নিথর দেহ খুঁজে পান স্বজনরা।


উপসংহার জুলাইয়ের এই গণঅভ্যুত্থানে রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্মমতা কোনো বয়স বা সীমানা মানেনি। যারা দেশের ভবিষ্যৎ হতে পারত, তারা পরিণত হয়েছে রক্তাক্ত লাশে। জানালার গ্রিল, ঘরের বারান্দা বা বাবার কোল—কোথাও যখন জীবনের নিরাপত্তা থাকে না, তখন সেই রাষ্ট্রের বিচারহীনতার ক্ষত মুছে ফেলা এককথায় অসম্ভব। এই শিশুগুলোর ঝরে যাওয়া আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা ও নতুন বাংলাদেশের মূল্য কতটা ভারী।


Comments (0)

Login to leave a comment.

No comments yet. Be the first to comment.


Related posts