বন্ধুকে বাঁচাতে গিয়ে নিজে গুলি খেলেন রাফি: ৫ আগস্টের বিজয় মিছিলে তারুণ্যের নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের এক অনন্য উপাখ্যান
ঢাকা — ৫ আগস্ট, ২০২৪। ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সারা দেশ যখন বাঁধভাঙা বিজয়োল্লাসে মেতে উঠেছিল, তখনো ঢাকার রাজপথে কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছিল কালো ধোঁয়া আর বারুদের গন্ধ। বিজয়ের সেই আনন্দ মিছিলে অংশ নিতে গিয়ে সহযোদ্ধা বন্ধুকে বাঁচাতে নিজের জীবন বিপন্ন করেছিলেন মোহাম্মদ রাফি নামের এক তরুণ। শরীরে শতাধিক ছররা ও ভারী গুলির ক্ষত নিয়ে আজ হাসপাতালের বিছানায় পঙ্গুত্বের আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন তিনি।
শ্যামলীর বিজয় মিছিলে অতর্কিত হামলা ডিবিসি নিউজের বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার রায়পুরা গ্রামের বাসিন্দা রাফি চাকরির সুবাদে ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। দেশে ছাত্র আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকেই তিনি সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে রাজপথে যুক্ত হন।
৫ আগস্ট বিকেলে পতন ও বিজয়ের খবর আসার পর ঢাকার শ্যামলী এলাকায় একটি বিজয় মিছিলে যোগ দেন রাফি ও তার সঙ্গীরা। মিছিলটি যখন শ্যামলী এলাকায় পৌঁছায়, তখন হঠাৎ করেই তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায় হেলমেটধারী কিছু সশস্ত্র সন্ত্রাসী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্য। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা মিছিলে থাকা লোকজনের ওপর নির্বিচারে গুলি চালাতে শুরু করে।
বন্ধুকে বাঁচাতে গিয়ে নিজে গুলিবিদ্ধ গোলাগুলির সেই ভয়ংকর মুহূর্তে রাফি দেখেন, তার ঠিক পাশেই এক সহযোদ্ধা গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েছেন। বন্ধুকে বাঁচাতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে রাফি ছুটে যান তাকে উদ্ধার করতে। ঠিক তখনই সন্ত্রাসীদের একটি গুলি এসে লাগে রাফির ডান হাতে এবং অপর একটি শটগানের গুলি লাগে তার বাম হাতে।
চোখের সামনে সহযোদ্ধার ওপর নির্যাতন এবং নির্মম মৃত্যুর দৃশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন রাফি। তিনি জানান, পুলিশের পোশাকে এবং হেলমেট পরা কিছু লোক এতটাই নির্মম ছিল যে তারা চোখের সামনে মানুষকে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করেছে। রাফি নিজে গুরুতর আহত হওয়া সত্ত্বেও বন্ধুকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
শরীরে দেড়শ বুলেটের ক্ষত ও অসহায় চিকিৎসা চিকিৎসার জন্য ঢাকায় থাকার সামর্থ্য না থাকায় এবং চরম আর্থিক অনটনের কারণে রাফির পরিবার তাকে দ্রুত গ্রামের বাড়ি বরিশালে নিয়ে যায়। বর্তমানে তিনি বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
রাফির শরীরের অবস্থা এতটাই শোচনীয় যে, তার শরীরে প্রায় ১৪১ থেকে ১৪২টি বুলেট বা ছররা গুলি ঢুকেছিল। এর মধ্যে কেবল একটি বড় মূল গুলি ঢাকায় অস্ত্রোপচার করে বের করা হলেও বাকিগুলি এখনও তার শরীরে রয়ে গেছে, যা তার হাতকে প্রায় পঙ্গু করে দিয়েছে। পরিবারের ধারদেনা ও নিজস্ব সীমিত সামর্থ্য দিয়ে কোনোমতে চলছে তার চিকিৎসা। এমতাবস্থায় উন্নত চিকিৎসা ও একটু স্বাভাবিক জীবনের জন্য বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও দেশবাসীর সহযোগিতা কামনা করেছেন তার পরিবার।
উপসংহার ৫ আগস্টের এই বিজয় কোনো সাধারণ বিজয় ছিল না; এটি অর্জিত হয়েছে রাফির মতো হাজারো তরুণের রক্ত, অঙ্গহানি আর নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের বিনিময়ে। বন্ধুকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের হাত হারিয়ে ফেলা রাফির এই করুণ অথচ বীরত্বপূর্ণ গল্প জুলাই বিপ্লবের ইতিহাসে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে।
Comments (0)
Login to leave a comment.
No comments yet. Be the first to comment.
Related posts
জুলাই ৩৬
সুনামগঞ্জের গ্যারেজে লুকিয়ে থাকা যুবকের পায়ে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে গুলি চালায় যে পুলিশ কর্মকর্তারা
জুলাই ৩৬
আধা সামরিক বাহিনী ব্যবহার করে দমনপীড়ন এবং কমান্ড রেসপন্সিবিলিটির বিতর্ক
জুলাই ৩৬