36July
জুলাই ৩৬

আয়নাঘর: গুম তদন্ত কমিশনের বর্ণনায় উঠে এলো শেখ হাসিনা সরকারের পৈশাচিকতার চিত্র

by Ataullah Rahman Polas · · 18 views
আয়নাঘর: গুম তদন্ত কমিশনের বর্ণনায় উঠে এলো শেখ হাসিনা সরকারের পৈশাচিকতার চিত্র

ঢাকা — "এইটা যে কত নিষ্ঠুর, কত বর্বর, তা একমাত্র ভুক্তভোগীই জানেন। আমরা পরিদর্শন করে যা দেখেছি, তা সাধারণ মানুষের কল্পনারও অতীত।" কথাগুলো বলছিলেন বিগত ১৫ বছরের গুম ও ‘আয়নাঘর’-এর ঘটনাগুলো তদন্তের জন্য গঠিত গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের অন্যতম সদস্য ও মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন।

সম্প্রতি তদন্তে বেরিয়ে আসা সিক্রেট সেল বা গোপন বন্দিশালাগুলোর যে বিভীষিকাময় চিত্র তিনি তুলে ধরেছেন, তা শুনলে যে কারও গা শিউরে উঠবে। গুমের শিকার ব্যক্তিদের ওপর চালানো পৈশাচিক নির্যাতনের বর্ণনায় উঠে এসেছে শ্বাসরোধ করে হত্যা, পেট কেটে বস্তায় ভরে নদীতে লাশ ফেলে দেওয়া এবং অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটানো বন্দিদের মর্মস্পর্শী দিনলিপির কথা।


৪ বাই ৩ ফুটের অন্ধকার গুহা তদন্ত কমিশনের বর্ণনা অনুযায়ী, বন্দিদের রাখা হতো মাত্র ৪ ফুট লম্বা ও সোয়া ৩ ফুট চওড়া (অথবা ক্ষেত্রবিশেষে ৫ ফুট বাই সোয়া ৩ ফুট) ছোট্ট একটি প্রকোষ্ঠে, যা একটি সাধারণ বাথরুমের চেয়েও ছোট। সেখানেই একটি ড্রেনেজ ব্যবস্থা ছিল মলমূত্র ত্যাগের জন্য। শ্বেতসেঁতে, আলোহীন ও বাতাসহীন সেই অন্ধকার প্রকোষ্ঠে দিন ও রাতের কোনো পার্থক্য বোঝার উপায় ছিল না।

নূর খান লিটন জানান, "বন্দিরা সকালের নাশতা (রুটি বা খিচুড়ি) দেখে কেবল বুঝতে পারতেন যে নতুন একটি দিন শুরু হয়েছে। গুহামানবদের মতো তারা নখ দিয়ে, ইটের টুকরো বা থালা দিয়ে আঁচড় কেটে দেয়ালে দিন গণনার দাগ দিয়ে রাখতেন। আমরা এমন জায়গায় ১৮২ দিন বা ৩০০ দিনেরও বেশি সময় কাটানোর দাগ পেয়েছি।"


দেয়ালে লেখা মর্মস্পর্শী আকুতি অন্ধকার সেই সেলগুলোর দেয়ালে তদন্ত কমিশন অসংখ্য অস্পষ্ট মোবাইল নম্বর, নাম এবং মৃত্যুর আগের আর্তনাদ খোদাই করা অবস্থায় পেয়েছে। কেউ দেয়ালে আঁচড় কেটে লিখেছিলেন—"আই লাভ মাই ফ্যামিলি", কেউ লিখেছিলেন "বিজয় সুনিশ্চিত", আবার কেউবা কোরআনের সূরা বা "হে আল্লাহ তুমি আমাকে রক্ষা করো" লিখে রেখেছিলেন।


হত্যা ও লাশ গুমের পৈশাচিক পদ্ধতি জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বন্দিদের হত্যার জন্য বীভৎস সব পদ্ধতি ব্যবহার করত ঘাতকরা। নূর খান লিটনের বর্ণনায় উঠে আসে, "কাউকে ইনজেকশন পুশ করে, আবার কাউকে পলিথিন দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হতো। লাশ যাতে পানিতে ভেসে না ওঠে, সে জন্য পেট কেটে ডেডবডিকে সিমেন্টের বস্তার সাথে বেঁধে নদীর গভীর জায়গায় ফেলে দেওয়া হতো।"

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, লাশ গুম করার এই কাজে পোস্তগোলা এলাকায় একটি বিশেষ নৌকা ব্যবহার করা হতো। এই নৌকাটি মূলত সুন্দরবনের জলদস্যুদের কাছ থেকে র‍্যাব (র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন) উদ্ধার করেছিল এবং পরে সেটি ঢাকায় এনে লাশ গুমের কাজে ব্যবহার করা হয়।


শীর্ষ নেতৃত্বের সরাসরি সম্পৃক্ততা গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের এই সদস্য জানান, প্রতিটি গুমের ঘটনার গভীরে গিয়ে দেখা গেছে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তার সরকারের প্রভাবশালী নেতা ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সরাসরি সম্পৃক্ততা বা নির্দেশনা ছিল। সরকারের সর্বোচ্চ মহলের সায় ছাড়া দিনের পর দিন এমন প্রাতিষ্ঠানিক গুম ও হত্যাযজ্ঞ চালানো কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না।


এখনো কাটেনি আতঙ্ক তদন্ত কমিশন সব সিক্রেট সেল ও আয়নাঘরের ভিজ্যুয়াল প্রমাণ সংগ্রহ করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তবে মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন জানান, এখনো অনেক ভুক্তভোগী মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছেন। তাদের মনে এখনো আতঙ্ক কাজ করে যে, যদি স্বৈরাচার আবার ফিরে আসে বা তাদের ক্ষতি করে! তবে সময় গেলে এই অভিযোগের পাহাড় আরও বড় হবে বলে তিনি মনে করেন, কারণ এই অপরাধের শেকড় ধারণার চেয়েও অনেক গভীরে প্রোথিত।


Comments (0)

Login to leave a comment.

No comments yet. Be the first to comment.


Related posts