‘আন্দোলনে ছিল না সে, তবুও মায়ের কোল খালি হলো’: বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা চার বছরের শিশু আহাদের মর্মান্তিক মৃত্যু
ঢাকা — আন্দোলন কিংবা রাজনীতির ধারেকাছেও যার যাওয়ার বয়স হয়নি, যে কেবল মা-বাবার হাত ধরে ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাইরের দৃশ্য দেখছিল—একটি অন্ধ বুলেট নিমিষেই কেড়ে নিল সেই চার বছরের শিশু আহাদের প্রাণ।
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বিকালের সেই ভয়ংকর ঘটনা আজও কাঁদিয়ে যায় দেশের বিবেকবান মানুষকে। কোটা সংস্কার আন্দোলন ও পরবর্তী সহিংসতার দিনে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর রায়েরবাগ এলাকার একটি ভাড়াবাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় গুলিতে নিহত হয় ছোট্ট শিশু আহাদ।
বারান্দার সুন্দর বিকেল যেভাবে নরকীয় হয়ে উঠল এটিএন নিউজের বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, ১৯ জুলাই বিকেলে যাত্রাবাড়ীর রায়েরবাগের ১১ তলা ভবনের আটতলার বারান্দায় মা-বাবার সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিল চার বছরের শিশু আহাদ। বাসার নিচেই তখন আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষ চলছিল।
হঠাৎ করেই নিচ থেকে ছুটে আসা একটি বুলেট এসে সরাসরি আঘাত করে আহাদের ডান চোখে, যা গেঁথে যায় তার মস্তিষ্কের ভেতরে। প্রথমে মা-বাবা ভেবেছিলেন হয়তো বারান্দায় খেলতে গিয়ে মাথা ঘুরে পড়ে গেছে শিশুটি। কিন্তু আহাদকে মাটি থেকে তুলতে গিয়েই বাবা আবুল হাসান ও মা সুমি আক্তারের পুরো কোল ভেসে যায় রক্তে। মুহূর্তের মধ্যে এক সুন্দর পারিবারিক বিকেল পলকে পরিণত হয় এক দুঃসহ ও রক্তস্নাত অভিজ্ঞতায়।
আইসিইউতে লড়াই এবং চিরবিদায় গুরুতর আহত অবস্থায় রক্তমাখা ছোট্ট আহাদকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ)-এর লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে পরের দিন রাতে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই মারা যায় নিষ্পাপ আহাদ।
আহাদের বাবা আবুল হাসান ঢাকা আয়কর বিভাগে চাকরি করেন। গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরের ভাঙ্গার পুকুরিয়া গ্রামে তাকে দাফন করা হয়। আহাদের বাবা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক একটি তথ্য জানিয়ে বলেন, তাদের পরিবারে আগে নিজস্ব কোনো পারিবারিক কবরস্থান ছিল না। একমাত্র ছোট ছেলে আহাদের এই মর্মান্তিক মৃত্যুর মধ্য দিয়েই তাদের বাড়িতে নতুন করে পারিবারিক কবরস্থানের যাত্রা শুরু হলো!
উপসংহার বিক্ষুব্ধ রাজপথ থেকে ছিটকে আসা একটি বুলেটে চার বছরের শিশু আহাদের এই চলে যাওয়া প্রমাণ করে, সেই জুলাইয়ের দিনগুলোতে রাষ্ট্রযন্ত্রের সহিংসতা কতটা নির্মম ও অন্ধ হয়ে উঠেছিল। ছোট্ট আহাদের রক্তে ভেজা সেই বারান্দা আর তার অকালে ঝরে যাওয়ার স্মৃতি পরিবার এবং জাতির মনে চিরকাল গভীর ক্ষত হয়ে থাকবে।
Comments (0)
Login to leave a comment.
No comments yet. Be the first to comment.
Related posts
জুলাই ৩৬
‘আমার ছেলেরে মারলো ক্যান?’: পেটে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঝরে গেল ১০ বছরের শিশু হোসেনের তাজা প্রাণ
জুলাই ৩৬
‘হেলমেটধারীরা গুলি করে বাবাকে মারে’: রায়েরবাগের রাজপথে হেলমেট ও চাপাতি হাতে সেই তান্ডব মাথায় গুলি ও কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত’
জুলাই ৩৬