36July
জুলাই ৩৬

আমি যদি জানতাম আমার ছেলেকে পুলিশ গুলি করবে, তাহলে তাদের সামনে গিয়ে আমি দাঁড়াতাম’: বিজয়ের দিনে সাফওয়ানের মর্মান্তিক মৃত্যুর এক বুকফাটা গল্প

by Ataullah Rahman Polas · · 1 views
আমি যদি জানতাম আমার ছেলেকে পুলিশ গুলি করবে, তাহলে তাদের সামনে গিয়ে আমি দাঁড়াতাম’: বিজয়ের দিনে সাফওয়ানের মর্মান্তিক মৃত্যুর এক বুকফাটা গল্প

সাভার (ঢাকা) — "আমি যদি জানতাম পুলিশ আমার ছেলেকে গুলি করবে, তাহলে আমি পুলিশের সামনে গিয়ে দাঁড়াতাম—বলতাম, আমারে গুলি করে মেরে ফেলো!"—সন্তানহারা এক মায়ের বুকফাটা আর্তনাদে ভারী হয়ে আছে সাভারের সিআরপি রোডের ডগরমোড়ার সেই বাতাস।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন সরকারের পতন ও দেশত্যাগের খবর যখন বিজয়ের আনন্দ হয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল, ঠিক তখনই সাভার ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির মেধাবী শিক্ষার্থী সাফওয়ান আক্তার পুলিশের গুলিতে নিহত হয়। বিজয়ের সেই আনন্দ মিছিলই যে সাফওয়ানের জীবনের শেষ মিছিল হয়ে দাঁড়াবে, তা ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি তার পরিবার।

আনন্দ মিছিলে যাওয়ার সেই মুহূর্তটি প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগের খবর আসার পর সারা দেশের মতো সাভারেও বিজয়োল্লাস শুরু হয়। সাভারের সিআরপি রোডের ডগরমোড়ায় সাফওয়ানের বাসার নিচ থেকেই তার বাবা ফোন করে জানান যে আনন্দ মিছিল হচ্ছে, ছেলেকে যেন নিচে নামিয়ে দেওয়া হয়।

ছেলের পড়ার টেবিল থেকে ডেকে তোলার সেই স্মৃতিচারণ করে মা বলেন, "ও পড়াশোনা করছিল। বাবা ডাকছে শুনে খুশিতে ও এমনভাবে লাফ দিয়ে ছাদ থেকে নিচে নেমে গেল! আমি কি জানতাম আনন্দ মিছিল ওর জন্য শেষ মিছিল হয়ে থাকবে? যদি জানতাম, তবে আমার ছেলেকে আমি কখনোই পাঠাতাম না।"

সাফওয়ান আন্দোলনে যাওয়ার জন্য এর আগেও মায়ের কাছে বায়না ধরেছিল। কিন্তু মা অনুমতি না দেওয়ায় সে বাসার ছাদে দাঁড়িয়েই আন্দোলন দেখত। সেদিন মায়ের কাছ থেকে অনুমতি পেয়ে খুশিতে গদগদ হয়ে সে মিছিলে যোগ দিয়েছিল। একটু পর সাভারের পাখিবাগান বাসস্ট্যান্ডের দিকে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হলে সে বন্ধুদের সঙ্গে মিছিলে থেকে যায়।

হাসপাতালের মর্গে ছেলের লাশ শনাক্ত প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ৫ আগস্ট বিকেল ৫টা থেকে সাড়ে ৫টার মধ্যে সাভারের ওই এলাকায় বিজয়ী জনতার ওপর পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়। বাহু ও বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়ে সাফওয়ান। স্থানীয়রা তাকে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।

রাত ৯টার পর সাফওয়ানের বাবা যখন ছেলের খোঁজ করছিলেন, তখন তার গৃহশিক্ষক এনাম মেডিকেলের সামনে রাখা বেশ কয়েকটি লাশের মধ্য থেকে সাফওয়ানকে শনাক্ত করেন। হাসপাতালের ডেথ রিপোর্টে স্পষ্ট লেখা ছিল—তাকে মৃত অবস্থায় (Bring Dead) হাসপাতালে আনা হয়েছিল।

প্রতিবন্ধী বোনের আশ্রয় ও সাফওয়ানের খালি ঘর সাফওয়ানের বড় বোন আতকিয়া জামান তিশমা প্রতিবন্ধিতার কারণে কথা বলতে পারেন না। ভাইয়ের কোনো খোঁজ না পেলে বা তার কথা মনে পড়লে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। সাফওয়ানের মা জানান, সাফওয়ান প্রতিদিন তাকে মিনিটে ৫০ বার ‘মা’ বলে ডাকত এবং বলত, "মা, আপির কষ্ট নিয়ে তুমি ভেবো না, আপির সব দায়িত্ব আমি নেব।"

জামালপুর সদরের রঘুনাথপুরে পারিবারিক কবরস্থানে সাফওয়ানকে দাফন করা হয়েছে। তার পড়ার টেবিলে শেষবারের মতো পড়তে থাকা বইগুলো আজও আগের মতো খোলা পড়ে আছে, তার হারমোনিয়াম, তবলা ও গিটার অবিকল আছে—শুধু নেই শুধু সাফওয়ান নিজে।

উপসংহার ৫ আগস্টের এই বিজয় যেমন কোটি মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছিল, তেমনি সাফওয়ানের মতো শত শত মেধাবী শিক্ষার্থীর রক্তে তা চিরকালের জন্য এক গভীর ক্ষত তৈরি করে গেছে। বিজয়ের আনন্দ মিছিলে গিয়ে পুলিশের গুলিতে সাফওয়ানের এই চলে যাওয়া এ দেশের ইতিহাসে এক মর্মান্তিক অধ হয়ে থাকবে।


Comments (0)

Login to leave a comment.

No comments yet. Be the first to comment.


Related posts