36July
জুলাই আন্দোলন

যখন অ্যাম্বুলেন্স উধাও, ভরসা তখন তিন চাকার রিকশা: জুলাই বিপ্লবে শ্রমজীবী মানুষের অজানা বীরত্ব

by Ataullah Rahman Polas · · 16 views
যখন অ্যাম্বুলেন্স উধাও, ভরসা তখন তিন চাকার রিকশা: জুলাই বিপ্লবে শ্রমজীবী মানুষের অজানা বীরত্ব

ঢাকা — ২৪-এর জুলাইয়ে শহরটা যখন কাঁপছিল, রাজপথ যখন বুলেটের আঘাতে লাল হচ্ছিল, তখন শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতারাই নন—বুক পেতে দিয়েছিলেন এ দেশের খেটে খাওয়া সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ। কোটা সংস্কার আন্দোলন যখন গণহত্যার মুখে পড়ে, তখন হকার, দিনমজুর, চা-দোকানি থেকে শুরু করে তিন চাকার রিকশাচালকরাই হয়ে উঠেছিলেন ছাত্রদের সবচেয়ে বড় ঢাল। জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস লিখতে গেলে এই শ্রমজীবী মানুষদের রক্ত আর ঘামের গল্প কোনোভাবেই বাদ দেওয়া সম্ভব নয়।


রক্তভেজা রিকশা ও নাফিসের লাশ আন্দোলনের চরম উত্তেজনাকর মুহূর্তে যখন রাস্তায় কোনো অ্যাম্বুলেন্স ছিল না, তখন আহত ও নিহতদের উদ্ধারে দেবদূতের মতো এগিয়ে এসেছিলেন রিকশাচালকরা। শহীদ মুগ্ধকে যেমন একটি রিকশায় করে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল, তেমনি শহীদ নাফিসের নিথর দেহও বয়ে নিয়েছিল আরেকটি রিকশা।

নাফিসের লাশ বহনকারী রিকশাচালক নূর মোহাম্মদ সেই ভয়াবহ স্মৃতির কথা স্মরণ করে বলেন, "আলরাজি হাসপাতাল পর্যন্ত আমি একা লইয়া গেছি। একটা পাখিও আসে নাই যে তাকে ধরবে। আমি নিজেই ক্লান্ত, ওখান থেকে টাইনা আমি চক্ষু হাসপাতাল পর্যন্ত একা লইয়া গেছি।"


সুজনের সেই আইকনিক ও বিপ্লবী স্যালুট গোটা বিশ্বের নজর কেড়েছিল রিকশাচালক সুজনের সেই উন্নত শিরের স্যালুট। পুলিশের ব্যারিকেডের সামনে রিকশায় বসে এক হাত বাঁধা অবস্থায় তার সেই স্যালুট যেন সাহসের বারুদ হয়ে তরুণদের হৃদয়ে দ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছিল।

সুজন বলেন, "দেখতেছি শিশু বাচ্চারা মারা যাইতেছে... আমরা যদি তাদের পাশে না দাঁড়াই তাহলে ছাত্রজনতা থাকবে না। তাই আমি একটা সম্মান জানাইলাম। এক হাত আমার বাধা, আরেক হাত দিয়ে আমি স্যালুট দিলাম।"


বুলেটের দাগ ও ‘লোকাল অ্যাম্বুলেন্স’ আহত শহর যখন অ্যাম্বুলেন্সহীন হয়ে পড়েছিল, তখন রিকশাই হয়ে উঠেছিল ভরসার জায়গা। ফায়ারিংয়ের সময় রাস্তায় পড়ে থাকা ছাত্রদের উদ্ধারে যখন কেউ সাহস পাচ্ছিল না, তখন এই রিকশাচালকরাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাদের তুলে নেন। শুধু উদ্ধারই নয়, তাদের অনেকেই নিজেরাও বুলেটের শিকার হয়েছেন। এখনো অনেক রিকশাচালকের গায়ে রাবার বুলেটের চিহ্ন রয়ে গেছে।

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা কৃতজ্ঞতাভরে স্বীকার করেন, "অ্যাম্বুলেন্স সংকট চলাকালে আমাদের লোকাল অ্যাম্বুলেন্স হিসেবে এই রিকশাচালক ভাইরাই ছিলেন। উনাদের অংশগ্রহণ যখন আমরা পাই, তখনই আমরা নিশ্চিত হই যে এই আন্দোলন আর শুধু ছাত্রদের নেই, এটি ছাত্র-জনতার বিপ্লবে পরিণত হয়েছে।"


‘তারা কি আমাদের ভাই-ব্রাদার নয়?’ কেবল রিকশাচালকই নন, ফুটপাতের হকাররাও ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন বুলেটের সামনে। চরম ফায়ারিংয়ের মধ্যেও এক হকারকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে দেখে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, "একটু সামনে এগিয়ে যাচ্ছি কারণ যদি দুই-একজন ভাই-ব্রাদারও বাঁচানো যায়... তারা কি আমাদের ভাই-ব্রাদার নয়?"


উপসংহার জুলাইয়ের সেই অন্ধকার সময়ে আলোর পথ দেখিয়েছিলেন এই সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষেরাই। তাদের তিন চাকার প্যাডেল শুধু রিকশাই টানেনি, টেনেছিল পুরো একটি জাতির মুক্তির ভারও। হাজারো শহীদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আজকের যে নতুন বাংলাদেশ, তার প্রতিটি ইটে মিশে আছে এই নাম না জানা শ্রমজীবী মানুষদের নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ।


Comments (0)

Login to leave a comment.

No comments yet. Be the first to comment.


Related posts