কাউকে দেখামাত্র গুলি করা হবে’: ২০ জুলাইয়ের কঠোর কারফিউ এবং বুলেটের ভয়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তারুণ্যের সেই রাজপথ দখল
ঢাকা — ২০ জুলাই, ২০২৪। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ও উত্তপ্ত দিনগুলোর একটি। আগের দিনগুলোতে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া তীব্র সংঘর্ষ ও আন্দোলন দমাতে ২০ জুলাই সারাদেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য কঠোর কারফিউ জারি করে তৎকালীন সরকার। ঘোষণা করা হয় সাধারণ ছুটি। একই সঙ্গে ক্ষমতাসীন সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়—কারফিউ অমান্য করে রাস্তায় কাউকে দেখামাত্রই গুলি (Shoot on Sight) করা হবে।
কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের এই চরম হুমকি এবং ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের অন্ধকার ভেদ করেও সেদিন থেমে থাকেনি ছাত্র-জনতা। বরং বুলেটের ভয়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কারফিউ ভেঙে রাজপথে নেমে এসেছিল হাজারো প্রতিবাদী তরুণ।
কারফিউ, ইন্টারনেট বন্ধ ও দেশজুড়ে সংঘর্ষ ১৮ জুলাই থেকে বন্ধ থাকা ইন্টারনেট সেবা ২০ জুলাইও চালু করা হয়নি, যার ফলে পুরো দেশ একরকম বহির্জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। এর মাঝেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পুলিশ, বিজিবি, র্যাব এবং সরকারি দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের দফায় দফায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বাঁধে।
যাত্রাবাড়ী, নিউমার্কেট, সায়েন্সল্যাব, উত্তরা, মিরপুর ও বাড্ডাসহ ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে দিনভর চলে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া। মিরপুরের কাজীপাড়া মেট্রো রেল স্টেশনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়িতে আগুন লাগার পর সেখানে আটকা পড়া শতাধিক মানুষকে হেলিকপ্টারের সহায়তায় উদ্ধার করতে হয়। সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁজোয়া যানের পাশাপাশি আকাশে টহল দেয় র্যাবের হেলিকপ্টার।
রক্তাক্ত রাজপথ ও প্রাণহানির মিছিল কঠোর কারফিউ ও ‘দেখামাত্র গুলির’ নির্দেশ থাকার পরেও সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা যখন রাজপথ ছাড়েননি, তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে সেদিন কেবল ঢাকাতেই নয়, সারা দেশে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০ জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও গুলিতে অন্তত ২১ থেকে ২৬ জন নিহত হন, যার মধ্যে পুলিশ সদস্যও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। হাসপাতালগুলোতে কেবল গুলিবিদ্ধ মানুষ আর লাশের স্রোত নামতে শুরু করে। চিকিৎসকরা জানান, সেদিনের হামলায় সবচেয়ে বেশি বুলেট ইনজুরি বা স্প্লিন্টারের আঘাত পাওয়া রোগী ভর্তি হয়েছিল।
সমন্বয়কদের তুলে নেওয়ার অভিযোগ ও রাজনৈতিক টানাপড়েন ২০ জুলাইয়ের আরেকটি অত্যন্ত নাটকীয় ঘটনা ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শীর্ষ স্থানীয় নেতাদের ওপর দমনপীড়ন। এদিন আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামকে ডিবি পরিচয়ে তুলে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে সারজিস আলম, হাসনাত আব্দুল্লাহ ও হাসিব আল ইসলামকেও তুলে নেওয়ার খবর পাওয়া যায়।
গভীর রাতে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্দায় তৎকালীন সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের কিছু প্রতিনিধির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং সরকারের পক্ষ থেকে আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা প্রচার করা হয়। তবে আন্দোলনকারীদের অন্যান্য অংশ ও মাঠপর্যায়ের শিক্ষার্থীরা জোরালোভাবে দাবি করেন যে, হেফাজতে থাকা সমন্বয়কদের দিয়ে জোরপূর্বক স্ক্রিপ্ট পড়িয়ে এই ঘোষণা দেওয়ানো হয়েছে এবং তাদের পূর্বঘোষিত কর্মসূচি ও আন্দোলন যথারীতি চলবে।
উপসংহার ১৬ থেকে ২০ জুলাই—এই চারদিনের রক্তক্ষরণে দেড় শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটলেও, ২০ জুলাইয়ের কারফিউ ভাঙার ঘটনাটি প্রমাণ করেছিল যে স্বৈরাচারী শাসন টিকিয়ে রাখতে যত কঠোর আইন বা বুলেটের হুমকিই দেওয়া হোক না কেন, জনতার ক্ষোভ ও তারুণ্যের অধিকার আদায়ের লড়াইকে তা দমন করতে পারে না। ২০ জুলাইয়ের সেই রক্তস্নাত প্রতিরোধই পরবর্তীতে ৫ আগস্টের চূড়ান্ত বিজয়কে ত্বরান্বিত করেছিল।
Comments (0)
Login to leave a comment.
No comments yet. Be the first to comment.
Related posts
জুলাই আন্দোলন
‘রাতে রাজাকার তকমা, দুপুরে রক্তপাত’: ১৫ জুলাইয়ের সেই দুঃসহ স্মৃতি এবং ছাত্র আন্দোলন থেকে গণ-আন্দোলনে রূপ নেওয়ার ইতিহাস
জুলাই আন্দোলন
শিক্ষার্থী ছাড়িয়ে রাজপথে নামে সর্বস্তরের মানুষ: শনির আখড়া ও কাজলায় পুলিশ-বিজিবির সাথে দফায় দফায় সংঘর্ষ
জুলাই আন্দোলন