36July
জুলাই আন্দোলন

‘রাতে রাজাকার তকমা, দুপুরে রক্তপাত’: ১৫ জুলাইয়ের সেই দুঃসহ স্মৃতি এবং ছাত্র আন্দোলন থেকে গণ-আন্দোলনে রূপ নেওয়ার ইতিহাস

by Ataullah Rahman Polas · · 1 views
‘রাতে রাজাকার তকমা, দুপুরে রক্তপাত’: ১৫ জুলাইয়ের সেই দুঃসহ স্মৃতি এবং ছাত্র আন্দোলন থেকে গণ-আন্দোলনে রূপ নেওয়ার ইতিহাস

ঢাকা — জুলাই অভ্যুত্থানের ইতিহাসে ১৫ জুলাই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও টার্নিং পয়েন্ট বা মোড় ঘোরানো দিন। আগের রাতে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে দেওয়া এক তীর্যক মন্তব্য ও ‘রাজাকার’ ট্যাগিংয়ের ক্ষোভ যখন দাউ দাউ করে জ্বলছিল, ঠিক পরদিন দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নেমে আসে রক্তপাত ও বর্বরোচিত হামলার তাণ্ডব।

যমুনা টিভির বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ১৫ জুলাইয়ের সেই দুঃসহ স্মৃতি, যেদিন সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চূড়ান্তভাবে গণ-আন্দোলনে রূপ নিতে শুরু করেছিল।

ঢাবি ক্যাম্পাসে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও চার শতাধিক শিক্ষার্থী আহত ১৫ জুলাই বেলা ১২টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে জড়ো হন ঢাবির সাত কলেজ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের শত শত শিক্ষার্থী। আগের রাতের ‘রাজাকার’ স্লোগানের ক্ষোভ তখনো তাদের চোখে-মুখে।

হঠাৎ করেই বিজয় একাত্তর হলের সামনে আন্দোলনকারীদের আটকে রাখার খবর ছড়িয়ে পড়লে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পুরো ক্যাম্পাস। আগে থেকেই অবস্থান নেওয়া তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা লাঠিসোঁটা, রড ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। শিক্ষার্থীরাও ইটপাটকেল ছুড়ে প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেন। প্রায় ৪০ মিনিট ধরে চলা এই সংঘর্ষে নারী শিক্ষার্থীসহ অন্তত ৪০০ জন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন।

রক্তাক্ত ও আহত শিক্ষার্থীদের অনেককে রিকশায় বা কাঁধে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেও আহত শিক্ষার্থীদের আর্তনাদ এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় হামলা চালানোর মতো নির্মমতার সাক্ষী হয় দেশবাসী। বিকেল চারটার পর পুরো ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণ নেয় ছাত্রলীগ এবং হেলমেট পরে অস্ত্রহাতে মহড়া চালাতে শুরু করে তারা।

প্রগতি সরণিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অভিষেক ঢাবির রক্তপাতের মাঝেই ১৫ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনে প্রথমবারের মতো রাজপথে নামে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বেলা ১২টার দিকে প্রগতি সরণি, বাড্ডা ও কুড়িল এলাকায় ইউআইইউ, এআইইউবি এবং নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন।

শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত জোরালো কণ্ঠে ঘোষণা দেন, "প্রধানমন্ত্রী আমাদের কীভাবে রাজাকার বলতে পারেন? কেউ আমাদের রাজাকার বললেই তো আমরা রাজাকার হয়ে যাই না। আমরা সবাই এ দেশের সন্তান!" রাতের অন্ধকারে টেলিগ্রাম গ্রুপের মাধ্যমে সুপরিকল্পিতভাবে সংগঠিত হয়ে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির এই তরুণরা সেদিন আন্দোলনের এক নতুন মাত্রা যোগ করেন এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে শক্ত হাতে দাঁড়িয়ে সংহতি জানান।

দেশজুড়ে সংঘাত এবং মন্ত্রীদের উস্কানিমূলক বক্তব্য ঢাকার বাইরেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর, খুলনা, সিলেট ও রাজশাহীতে শিক্ষার্থীদের ওপর একই কায়দায় হামলা চালায় ছাত্রলীগ। একদিকে যখন রাজপথে শিক্ষার্থীরা রক্তাক্ত হচ্ছিলেন, অন্যদিকে তখন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বসে তখনকার সরকারের মন্ত্রী ও নীতিনির্ধারকরা আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে ছাত্রলীগকে আরও হিংস্র হয়ে ওঠার প্ররোচনা জোগাচ্ছিলেন।

পরিস্থিতি সামাল দিতে ওই দিন সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন হল প্রভোস্টদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করে এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপদ অবস্থান ও বহিরাগতদের জন্য হল বন্ধসহ কয়েকটি সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে—রক্তাক্ত ১৫ জুলাইয়ের এই বর্বরোচিত হামলা শিক্ষার্থীদের মনের সমস্ত ভয় ভেঙে দিয়েছিল এবং এই আন্দোলনকে একটি সর্বগ্রাসী গণঅভ্যুত্থানে পরিণত করেছিল।

উপসংহার ১৫ জুলাইয়ের রক্তপাত এবং শিক্ষার্থীদের ওপর চালানো নিপীড়ন প্রমাণ করেছিল যে, দমন-পীড়ন চালিয়ে কোনো ন্যায়সঙ্গত অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে দাবিয়ে রাখা যায় না। ঢাবি ক্যাম্পাসের ইট-পাথর আর প্রগতি সরণির রাজপথ সেদিন যে ঐক্যের বীজ বুনেছিল, তা-ই পরবর্তীতে ৫ আগস্টের চূড়ান্ত বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল।


Comments (0)

Login to leave a comment.

No comments yet. Be the first to comment.


Related posts