উত্তরায় সাউন্ড গ্রেনেড, ইসিবি চত্বরে ৯ দফার হুংকার: ২ আগস্ট যেভাবে উত্তপ্ত ছিল ঢাকা
ঢাকা — "যার সন্তান মারা গেছে, কেবল সেই মা-ই বোঝেন সন্তান কতটা মূল্যবান। আমি চাই সব মায়েরা নেমে আসুক, সব গার্ডিয়ান এবং শিক্ষকদের পথে নেমে আসা উচিত।" কথাগুলো বলছিলেন ২ আগস্ট রাজধানীর ইসিবি চত্বরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে আসা এক সাধারণ অভিভাবক।
২০২৪ সালের ২ আগস্ট। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৯ দফা দাবি ঘিরে সেদিন রাজধানী ঢাকার উত্তরা, মিরপুর ও ইসিবি চত্বর পরিণত হয়েছিল তীব্র ক্ষোভ আর উত্তেজনার এক রণক্ষেত্রে। পুলিশের মুহুর্মুহু সাউন্ড গ্রেনেড আর টিয়ারশেলের মুখেও সেদিন বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিল সাধারণ শিক্ষার্থীরা। আর সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গা হয়ে রাজপথে তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন অভিভাবক ও সাধারণ মানুষ।
উত্তরায় পুলিশের ক্র্যাকডাউন ও ত্রাস যমুনা টিভির ফুটেজ ও সেদিনের ঘটনাপ্রবাহ থেকে জানা যায়, বিকেলের দিকে উত্তরায় ১১ নম্বর সেক্টরের বিভিন্ন গলি থেকে জমায়েত হতে শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। কিন্তু জমায়েত বড় হওয়ার আগেই পুলিশ অতর্কিতে তাদের ওপর অ্যাকশন শুরু করে।
শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে মুহুর্মুহু সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করা হয়। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, পুলিশের পাশাপাশি একই সময়ে ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডাররাও তাদের ওপর হামলা চালায়। মুহূর্তের মধ্যেই পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রাণ বাঁচাতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা আশপাশের বিভিন্ন বাসাবাড়িতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
ইসিবি চত্বর ও মিরপুরে ৯ দফার হুংকার উত্তরায় যখন পুলিশি ক্র্যাকডাউন চলছে, তখন রাজধানীর কালশীর ইসিবি চত্বর এবং মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরে বিশাল বিক্ষোভ মিছিল করেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। পুলিশের উপস্থিতিতেই টানা কয়েক ঘণ্টা অবস্থান নিয়ে তারা আটক শিক্ষার্থীদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানান।
ক্ষোভে ফেটে পড়া এক শিক্ষার্থী বলেন, "আমাদের ভাই-বোনদের রক্ত ঝরছে, আমাদের ঘুম হয় না! শুধুমাত্র আমাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সানি স্যারের মতো শিক্ষকদের তুলে নেওয়া হচ্ছে। আমাদের ভাই হত্যার বিচার কই? আমাদের ৯ দফা মানলে আন্দোলন থামবে, না মানলে এই আন্দোলন চলতেই থাকবে।"
শিক্ষার্থীদের পাহারায় মায়েরা ২ আগস্টের এই দিনটির সবচেয়ে আবেগঘন দৃশ্য ছিল রাজপথে অভিভাবকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। রাস্তায় রোদে পুড়ে, টিয়ারশেলের ধোঁয়ায় হাঁসফাঁস করা শিক্ষার্থীদের মুখে একটু পানি তুলে দিতে সেদিন বাসা থেকে পানির বোতল হাতে বেরিয়ে এসেছিলেন অনেক মা। তারা শুধু পানিই পান করাননি, বরং রাষ্ট্রযন্ত্রকে কড়া বার্তা দিয়ে সাধারণ মানুষদের রাজপথে নেমে আসার ডাক দিয়েছিলেন।
উপসংহার ২ আগস্ট উত্তরা, মিরপুর ও ইসিবি চত্বরের এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করেছিল যে, জুলাইয়ের এই আন্দোলন আর শুধু শিক্ষার্থীদের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। টিয়ারশেল আর সাউন্ড গ্রেনেড দিয়ে যে একটি পুরো সমাজকে দমিয়ে রাখা যায় না—রাজপথে মায়েদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই ছিল তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। আর এই সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণের পথ ধরেই ত্বরান্বিত হয়েছিল ৫ আগস্টের চূড়ান্ত বিজয়।
Comments (0)
Login to leave a comment.
No comments yet. Be the first to comment.
Related posts
জুলাই আন্দোলন
‘পুলিশের পায়ে এখন পলায়নপর দশা’: ৪ আগস্ট কুষ্টিয়ায় ছাত্র-জনতার ঝটিকা আক্রমণে থানা ও পার্টি অফিস ঘেরাও
জুলাই আন্দোলন
৪ আগস্ট: নেত্রকোনার রাজপথে লাঠিসোঁটা হাতে তারুণ্যের ঢল, ধাওয়া খেল পুলিশ
জুলাই আন্দোলন