36July
জুলাই আন্দোলন

রাষ্ট্রীয় শোক প্রত্যাখ্যান করে ‘লাল প্রোফাইলে’ প্রতিবাদ এবং জাস্টিস ঘোষণা

by Ataullah Rahman Polas · · 25 views
রাষ্ট্রীয় শোক প্রত্যাখ্যান করে ‘লাল প্রোফাইলে’ প্রতিবাদ এবং  জাস্টিস ঘোষণা

ঢাকা — ২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহে ৩০ জুলাই একটি অনন্য ও প্রতীকী প্রতিবাদের দিন হিসেবে ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিয়েছে। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের স্মরণে সেদিন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার এক দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালনের ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু ছাত্র-জনতা সরকারের সেই ‘লোক দেখানো মায়াকান্না’ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে এবং ফেসবুকসহ পুরো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম লাল রঙে রাঙিয়ে এক অভূতপূর্ব প্রতিবাদ গড়ে তোলে।

লাল প্রোফাইল ও চোখে-মুখে লাল কাপড়ের প্রতিবাদ সরকার নিহতদের স্মরণে ৩০ জুলাই কালো ব্যাজ ধারণ এবং মসজিদ-মন্দিরে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করেছিল। সরকারি দলের সমর্থকরা কালো প্রোফাইল ছবি দিয়ে এর পক্ষে অবস্থান নেয়। কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীরা এই রাষ্ট্রীয় শোক প্রত্যাখ্যান করেন। শহীদদের রক্তে রঞ্জিত রাজপথের প্রতীক হিসেবে এবং ন্যায়বিচারের দাবিতে তারা কালো রঙের বদলে প্রতিবাদের রং হিসেবে লালকে বেছে নেন।

মুহূর্তের মধ্যেই ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাখো মানুষের প্রোফাইল ছবি লাল রঙে পরিবর্তিত হয়ে যায়। অনেকেই মুখ ও চোখে লাল কাপড় বেঁধে ছবি প্রকাশ করেন। শিক্ষার্থীদের এই ব্যতিক্রমী কর্মসূচির প্রতি সংহতি জানিয়ে শিক্ষক, সাংবাদিক, লেখক, শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও লাল ফ্রেম ও ছবি ব্যবহার করেন।

শুধু অনলাইনেই নয়, অফলাইনেও চলে প্রতিবাদ। রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা মুখে লাল কাপড় বেঁধে মৌন মিছিল করেন। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও মানববন্ধন করেন এবং রাজধানীর গুলিস্তানে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো প্রতিবাদী গানের মিছিল বের করে। তবে এত কিছুর মধ্যেও সরকারের দমন-পীড়ন থেমে থাকেনি; সেদিনও চট্টগ্রাম ও পঞ্চগড়ে গুলি ও গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটে।

‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচি ঘোষণা এই দিন রাতেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আব্দুল কাদের টেলিগ্রাম অ্যাপের মাধ্যমে ৩১ জুলাইয়ের জন্য দেশব্যাপী ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ (ন্যায়বিচারের জন্য পদযাত্রা) কর্মসূচির ঘোষণা দেন। সারা দেশের আদালত চত্বর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাজপথে এই সমাবেশের আহ্বান জানানো হয়। এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল—গণহত্যা, গণগ্রেপ্তার, হামলা-মামলার প্রতিবাদ, জাতিসংঘের মাধ্যমে তদন্ত এবং শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবি বাস্তবায়ন।

সমন্বয়কদের মুক্তিতে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ডিবি হেফাজতে থাকা নাহিদ ইসলামসহ ছয় সমন্বয়কের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে বিশিষ্ট নাগরিকদের এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। বিক্ষুব্ধ নাগরিক সমাজ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আটক সমন্বয়কদের মুক্তি দেওয়া না হলে আরও কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেয়।

এদিকে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, গণগ্রেপ্তার ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। ‘দেখামাত্র গুলি’র নির্দেশ (শুট অ্যাট সাইট) ও আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে কড়া উদ্বেগ জানান ইউরোপীয় ইউনিয়নের তৎকালীন পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান জোসেপ বোরেল।

সরকারের কৌশল, গণগ্রেপ্তার ও জামায়াত নিষিদ্ধের প্রক্রিয়া আন্দোলনের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আহতদের দেখতে হাসপাতালে যান এবং সংঘাত-সহিংসতার তদন্তে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতা চান। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গণগ্রেপ্তারের কথা অস্বীকার করলেও, বাস্তবে সেদিন পর্যন্ত শুধু ঢাকাতেই ২৬৪টি মামলা (যার মধ্যে ৫৩টি হত্যা মামলা) দায়ের করা হয়েছিল এবং সারা দেশে গ্রেপ্তারের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়েছিল।

একদিকে যখন দেশজুড়ে গণগ্রেপ্তার ও ব্লক রেইড চলছিল, অন্যদিকে মানুষের দৃষ্টি ভিন্ন খাতে সরাতে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করার প্রক্রিয়া শুরু করে তৎকালীন সরকার। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সেসময় অভিযোগ করেছিলেন, গণহত্যার ঘটনা আড়াল করতেই সরকার জামায়াত নিষিদ্ধের নাটক সাজাচ্ছে।

উপসংহার ৩০ জুলাইয়ের এই লাল রঙের প্রতিবাদ প্রমাণ করেছিল যে, বন্দুকের নল কিংবা রাষ্ট্রীয় শোকের মোড়ক দিয়ে ছাত্র-জনতার ক্ষোভকে আর ধামাচাপা দেওয়া সম্ভব নয়। শোককে শক্তিতে পরিণত করে সেদিনই রচিত হয়েছিল স্বৈরাচার পতনের চূড়ান্ত ধাপের রূপরেখা।


Comments (0)

Login to leave a comment.

No comments yet. Be the first to comment.


Related posts