‘কয়টা বুলেট আছে আপনাদের? লাখো আবু সাঈদ বুক পেতে দাঁড়াবে’: শহীদ মিনারে মানজুর আল মতিনের বজ্রকণ্ঠ
ঢাকা — ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে সারা দেশ থেকে স্রোতের মতো মানুষ এসে জড়ো হতে থাকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। কোটা সংস্কার থেকে ততদিনে আন্দোলন রূপ নিয়েছে সরকার পতনের এক দফায়। লাখো জনতার সেই জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে সেদিন এক ঐতিহাসিক ও আবেগময় ভাষণ দিয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব মানজুর আল মতিন। তার সেই বজ্রকণ্ঠের প্রতিটি শব্দ যেন সেদিন উপস্থিত লাখো জনতার হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হয়েছিল এবং স্বৈরাচারের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল।
প্রবীণদের ব্যর্থতা স্বীকার ও তারুণ্যের জয়গান ভাষণের শুরুতেই দীর্ঘদিনের অন্যায়ের সামনে প্রবীণ প্রজন্মের নীরবতার কথা স্বীকার করে নেন মানজুর আল মতিন। তিনি বলেন, "আমরা পারিনি রে ভাই। এত বছর ধরে অন্যায় হয়েছে, আমরা চুপ করে দেখেছি। তোমরা পেরেছো, আমাদের তারুণ্য পেরেছে।"
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার লাইন উদ্ধৃত করে তিনি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, "বৃদ্ধ সাবধানী হইতে পারে না কভু, তোমাদের নেতা তোমাদের মাঝে আছে। তোমাদের মাঝে আছে বীর সব্যসাচী। আমাদের সমন্বয়করা আলোচনা করছেন, তারাই আমাদের নেতা। তারুণ্যই সিদ্ধান্ত নেবে কেমন হবে আমাদের পরের বাংলাদেশ।"
গুলি চালানোর চ্যালেঞ্জ: ‘কয়টা বুলেট আছে আপনাদের?’ সেদিন শহীদ মিনারের মঞ্চ থেকে ফ্যাসিস্ট সরকারের রক্তচক্ষুকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানান মানজুর আল মতিন। শহীদ আবু সাঈদ, মুগ্ধ এবং ফারহান ফাইয়াজের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি হুংকার দেন, "আজ সারা দেশের মানুষ পথে নেমেছে। গুলি চালিয়েছেন, আরো চালাবেন? চালান! লাখো আবু সাঈদ বুক পেতে দাঁড়াবে, লাখো মুগ্ধ বুক পেতে দাঁড়াবে, লাখো ফারহান ফাইয়াজ বুক পেতে দাঁড়াবে। কজনকে মারবেন? কটা বুলেট আছে আপনার?"
তিনি আরও বলেন, "দেয়ালের লিখন পড়ুন। সেখানে আপনার পতন লেখা আছে। শেখ হাসিনার পতনের পর কেমন বাংলাদেশ আমরা গড়ব, পতনের প্রক্রিয়া কী হবে, কার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর হবে—সেটাও তারুণ্য বলে দেবে।"
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি কঠোর বার্তা বক্তব্যের একপর্যায়ে মাঠে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের তাদের দায়িত্ব ও জবাবদিহির কথা স্মরণ করিয়ে দেন তিনি। পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশ করে তিনি বলেন, "আপনাদের সন্তানও এই গুলির মুখে পড়েছে। আপনাদের বেতন আমাদের টাকায় হয়, ভুলে যাবেন না!"
নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন ৫২, ৬৯, ৭১ এবং ৯০-এর গণজাগরণের ইতিহাসের সাথে ২৪-এর এই বিপ্লবকে এক সুতোয় গেঁথে মানজুর আল মতিন বলেন, "৫২-তে জেগেছি, ৬৯-এ জেগেছি, ৭১-এ জেগেছি, ৯০-এ জেগেছি... ২০২৪-এ নতুন বাংলাদেশ গড়ব আমরা। যে বাংলাদেশে বৈষম্য থাকবে না, ন্যায়বিচার থাকবে, অবিচার থাকবে না। যে বাংলাদেশে অকারণে শিশুর বুকে গুলি চলবে না।"
উপসংহার ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের এই সমাবেশ থেকেই মূলত সরকার পতনের চূড়ান্ত 'এক দফা' দাবি ঘোষিত হয়েছিল। মানজুর আল মতিনের সেই দিনের ভাষণ শুধু সাধারণ জনতাকেই উদ্দীপ্ত করেনি, বরং পুরো জাতিকে এক সুতোয় বেঁধে ৫ আগস্টের চূড়ান্ত বিজয়ের পথে এক বিশাল অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল।
Comments (0)
Login to leave a comment.
No comments yet. Be the first to comment.
Related posts
জুলাই আন্দোলন
‘পুলিশের পায়ে এখন পলায়নপর দশা’: ৪ আগস্ট কুষ্টিয়ায় ছাত্র-জনতার ঝটিকা আক্রমণে থানা ও পার্টি অফিস ঘেরাও
জুলাই আন্দোলন
৪ আগস্ট: নেত্রকোনার রাজপথে লাঠিসোঁটা হাতে তারুণ্যের ঢল, ধাওয়া খেল পুলিশ
জুলাই আন্দোলন