‘এ যেন যুদ্ধবিধ্বস্ত নারায়ণগঞ্জ’: পুড়ে ছাই অর্ধশতাধিক যানবাহন, লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হলেন সাংবাদিকরা
নারায়ণগঞ্জ — কোটা সংস্কার আন্দোলন ও পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার দিনে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডসহ পুরো জেলা যেন রূপ নিয়েছিল এক যুদ্ধবিগ্রহের মাঠে। চারদিকে শুধু ভাঙচুরের চিহ্ন, পোড়া গাড়ি আর ধ্বংসস্তূপ। দুষ্কৃতিকারীদের চালানো সেই নজিরবিহীন তান্ডবে ছাই হয়ে গেছে অর্ধশতাধিক যানবাহন, সরকারি-বেসরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। আর এই সহিংসতার মাঝে সবচেয়ে বড় বিপাকে পড়েছিলেন দিন এনে দিন খাওয়া পেশাজীবী মানুষ এবং পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে যাওয়া গণমাধ্যমকর্মীরা।
ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা আনন্দ টিভির প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জে আন্দোলনের নামে চলা ওই তাণ্ডবে রেহাই পায়নি সরকারি কোনো গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরও। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে অবস্থিত আঞ্চলিক আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) কার্যালয় এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) নগর ভবনে চালানো হয় ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ।
পাসপোর্ট অফিসের নিচতলা থেকে শুরু করে পাঁচতলা পর্যন্ত সব কাচ ও আসবাবপত্র চুরমার করে দেওয়া হয়। অফিসের সামনের ২৪টি গাড়ির একটিও অক্ষত রাখা হয়নি—চাকা থেকে শুরু করে এসি ও ইঞ্জিনের সমস্ত অংশ পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়। কর্মচারীরা আর্তনাদ করে বলেন, "আমরা অনেককেই মিনতি করেছি যেন আমাদের মারে না, কিন্তু তারা একটার পর একটা গাড়ি ও অফিসে আগুন ধরিয়ে দেয়।"
পেশাজীবী ও শ্রমিকদের মাথায় হাত এই ব্যাপক সহিংসতা ও দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনার ফলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন সাধারণ দিনমজুর, ড্রাইভার, মিস্ত্রি ও পরিবহন শ্রমিকরা। যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকা এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলতে না পারায় হাজার হাজার শ্রমিকের পরিবারে চরম আর্থিক সংকট দেখা দেয়। এক শ্রমিক ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে বলেন, "চারদিন গাড়ি না চালালে আমাদের ঘরে চাল থাকে না। অথচ সব মানুষের রিজিকের পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।" এছাড়া বিভিন্ন অফিস ও প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুরের পর এখনো হুমকি-ধামকির মধ্যে আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন কর্মজীবীরা।
গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর টার্গেট করে হামলা ধ্বংসযজ্ঞের এই মিছিলে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় ছিল সংবাদকর্মীদের ওপর সুনির্দিষ্ট আক্রমণ। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বহু গণমাধ্যমকর্মী দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হন। এমনকি নারী সংবাদকর্মীরাও লাঞ্ছনার হাত থেকে রেহাই পাননি।
এক সাংবাদিক তার ওপর হওয়া হামলার অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, "পাসপোর্ট অফিসের ফার্নিচার যখন বাইরে পোড়ানো হচ্ছিল, তখন আমার ব্যাগ ও ক্যামেরা সেই আগুনে ফেলে দেওয়া হয়। হামলাকারীরা বলছিল ক্যামেরা ছাড়, নইলে মেরে ফেলব। অথচ আন্দোলনকারী বা ছাত্রদের পরিচয়ের বাইরেও অনেক দুর্বৃত্ত সুনির্দিষ্টভাবে সাংবাদিকদের টার্গেট করেছিল।" নিরস্ত্র সংবাদকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে সেসময় চরম শঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
উপসংহার নারায়ণগঞ্জের এই ধ্বংসলীলা প্রমাণ করেছিল যে, যৌক্তিক আন্দোলন যখন সুযোগসন্ধানীদের হাতে সহিংসতার রূপ নেয়, তখন তার সবচেয়ে বড় খেসারত দিতে হয় সাধারণ পেশাজীবী মানুষ এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদকে। সংঘাতের সেই ভয়াবহ দিনগুলো আজও নারায়ণগঞ্জের মানুষের মনে গভীর আতঙ্ক ও ক্ষতের সৃষ্টি করে আছে।
Comments (0)
Login to leave a comment.
No comments yet. Be the first to comment.
Related posts
জুলাই আন্দোলন
শিক্ষার্থী ছাড়িয়ে রাজপথে নামে সর্বস্তরের মানুষ: শনির আখড়া ও কাজলায় পুলিশ-বিজিবির সাথে দফায় দফায় সংঘর্ষ
জুলাই আন্দোলন
আগস্টের সেই ভয়ংকর মহড়া: ফেনীতে ছাত্র-জনতার ওপর ভারী অস্ত্রের তাণ্ডব ও আড়ালে থাকা খুনিরা
জুলাই আন্দোলন