'এ যেন এক খণ্ডকালীন যুদ্ধ': ১৭ জুলাই বরিশালের রাজপথে যেভাবে রচিত হয়েছিল প্রতিরোধের গল্প
বরিশাল — "যারা জীবনে যুদ্ধ দেখেনি, তারা আজ বরিশালের রাজপথে একটি খণ্ডকালীন যুদ্ধ দেখল!"—১৭ জুলাইয়ের ভয়াবহ সংঘর্ষের বর্ণনা দিতে গিয়ে ঠিক এভাবেই নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা জানাচ্ছিলেন বরিশালের সাধারণ মানুষ।
২০২৪ সালের ১৭ জুলাই। কোটা সংস্কার আন্দোলনে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রংপুরের পাশাপাশি সেদিনের সবচেয়ে বড় রণক্ষেত্রগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছিল দক্ষিণাঞ্চলের বিভাগীয় শহর বরিশাল। বিশেষ করে শহরের নথুল্লাবাদ বাসস্ট্যান্ড এলাকায় সাধারণ শিক্ষার্থী এবং বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের মধ্যে টানা কয়েক ঘণ্টার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে পুরো এলাকা পরিণত হয়েছিল এক যুদ্ধক্ষেত্রে।
বিএম কলেজের শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে পুলিশের বাধা
আরটিভি নিউজের সরাসরি সম্প্রচারিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ঘটনার সূত্রপাত হয় সকালে। সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীরা সকালে একটি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি নিয়ে রাস্তায় নামলে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সাথে তাদের বাদানুবাদ শুরু হয়। বেলা গড়িয়ে দুপুর ১টা বাজতেই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
মুহুর্মুহু টিয়ারশেল ও রাবার বুলেটে রণক্ষেত্র নথুল্লাবাদ
শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ অতর্কিতে বৃষ্টির মতো টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করতে শুরু করে। পুলিশের এই আগ্রাসনের মুখেও সাধারণ শিক্ষার্থীরা পিছু হটেনি। তারাও ইটপাটকেল ছুড়ে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
টানা চার-পাঁচ ঘণ্টা ধরে পুরো নথুল্লাবাদ বাসস্ট্যান্ড ও এর আশপাশের মহাসড়ক পুলিশের টিয়ারশেল এবং শিক্ষার্থীদের ইটপাটকেলে অবরুদ্ধ হয়ে থাকে। রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন শিক্ষার্থীরা। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়া গণমাধ্যমকর্মীরাও প্রচণ্ড ধোঁয়া এবং ইটের আঘাতে আহত হন।
হামলার শিকার সাধারণ শ্রমিকরা
সংঘর্ষের একপর্যায়ে ধাওয়া খেয়ে শিক্ষার্থীরা নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনালের দিকে অগ্রসর হলে পুলিশ সেখানেও মুহুর্মুহু টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এর ফলে টার্মিনালের ভেতরে থাকা সাধারণ পরিবহন শ্রমিকরাও মারাত্মকভাবে আহত হন। রাবার বুলেট ও টিয়ারশেলের আঘাতে অসংখ্য শিক্ষার্থী এবং শ্রমিক সেদিন ক্ষতবিক্ষত হয়েছিলেন।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মহাসড়ক অবরোধ
একদিকে নথুল্লাবাদে যখন বিএম কলেজ ও অন্যান্য কলেজের শিক্ষার্থীরা পুলিশের সাথে লড়াই করছিলেন, ঠিক একই সময়ে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বরিশাল-পটুয়াখালী মহাসড়ক সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে রাখেন। তাদের অবরোধের কারণে ঢাকা থেকে বরিশাল ও দক্ষিণাঞ্চলের সকল রুটের যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
উপসংহার
১৭ জুলাই বরিশালের নথুল্লাবাদের এই সংঘাত প্রমাণ করেছিল যে, আন্দোলন দমাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের দমানোর পরিবর্তে পরিস্থিতিকে আরও অগ্নিগর্ভ করে তোলে। বুলেটের ভয় আর টিয়ারশেলের বিষাক্ত ধোঁয়া উপেক্ষা করে বরিশালের রাজপথে সেদিন যে প্রতিরোধের আগুন জ্বলেছিল, তা-ই মূলত পরবর্তীতে সারা দেশে গণঅভ্যুত্থানের স্ফুলিঙ্গ হিসেবে কাজ করেছে।
Comments (0)
Login to leave a comment.
No comments yet. Be the first to comment.
Related posts
জুলাই আন্দোলন
‘পুলিশের পায়ে এখন পলায়নপর দশা’: ৪ আগস্ট কুষ্টিয়ায় ছাত্র-জনতার ঝটিকা আক্রমণে থানা ও পার্টি অফিস ঘেরাও
জুলাই আন্দোলন
৪ আগস্ট: নেত্রকোনার রাজপথে লাঠিসোঁটা হাতে তারুণ্যের ঢল, ধাওয়া খেল পুলিশ
জুলাই আন্দোলন