36July
জুলাই আন্দোলন

ডিবি কার্যালয়ে জোরপূর্বক ‘আন্দোলন প্রত্যাহার’-এর ঘোষণা, তবুও থামেনি বিপ্লব

by Ataullah Rahman Polas · · 20 views
ডিবি কার্যালয়ে জোরপূর্বক ‘আন্দোলন প্রত্যাহার’-এর ঘোষণা, তবুও থামেনি বিপ্লব

ঢাকা — ২৪-এর রক্তাক্ত জুলাইয়ের দিনলিপিতে ২৮ জুলাই এক নাটকীয় ও গুরুত্বপূর্ণ দিন। এদিন গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয় থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৬ সমন্বয়কের এক ভিডিও বার্তার মাধ্যমে আকস্মিকভাবে সব কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু সরকারের এই কৌশল বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়। সাধারণ শিক্ষার্থী ও অন্য সমন্বয়করা দ্রুতই বুঝে যান যে এটি জোরপূর্বক আদায় করা বিবৃতি। ফলে আন্দোলন তো থামেইনি, উল্টো নতুন নেতৃত্বের অধীনে তা আরও তীব্র রূপ ধারণ করে।

ডিবি হেফাজতে আরও এক সমন্বয়ক ও সেই বিতর্কিত ভিডিও বার্তা আগের পাঁচ সমন্বয়কের পর ২৮ জুলাই ভোরে আরেক সমন্বয়ক নুসরাত তাবাসসুমকেও ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সরকারের পক্ষ থেকে যথারীতি দাবি করা হয় যে, ‘নিরাপত্তা দিতেই’ তাদের গোয়েন্দা হেফাজতে রাখা হয়েছে। এরপর রাতেই ডিবি হেফাজত থেকে একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করা হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, দৃশ্যত বিপর্যস্ত নাহিদ ইসলাম একটি লিখিত বক্তব্য পাঠ করে বলছেন, "সার্বিক স্বার্থে আমরা এই মুহূর্ত থেকে আমাদের কর্মসূচি প্রত্যাহার করছি।"

নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা পরবর্তীতে মুক্ত হয়ে ডিবি কার্যালয়ের সেই ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা জানান সমন্বয়করা। তারা জানান, তাদের হাত ও চোখ বেঁধে, জমটুপি পরিয়ে ঝুলিয়ে রেখে অমানবিক নির্যাতন ও মারধর করা হয়েছিল। টানা চার ঘণ্টা ঝুলিয়ে রেখে নির্যাতন করার পর ডিবি অফিসে চাপ দিয়ে ওই ভিডিও বার্তাটি রেকর্ড করা হয়। সমন্বয়করা জানান, তারা জানতেন না যে এই ভিডিও মিডিয়ায় প্রচার করা হবে; মূলত যেকোনো মূল্যে আন্দোলন স্থগিত করাই ছিল ডিবি পুলিশের প্রধান লক্ষ্য।

নেতৃত্বে উঠে আসেন অন্য সমন্বয়করা সমন্বয়কদের জিম্মি করে এই বক্তব্য দেওয়ানো হয়েছে—এই বার্তা দ্রুতই অন্যান্য সমন্বয়ক ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্রনেতারা জানান, তাদের আগে থেকেই সিদ্ধান্ত ছিল যে প্রথম সারির ১০০ জন সমন্বয়ককে গ্রেপ্তার করা হলেও তাদের পরবর্তী লেয়ারের (স্তরের) নেতারা প্রস্তুত থাকবেন।

সেদিন রাজপথ থেকে পিছু না হটার বিষয়ে এক দৃঢ় মনোভাব তৈরি হয়। নেতারা বুঝতে পেরেছিলেন, "এবার যদি হাসিনা কোনোভাবে বেঁচে যেতে পারে, তাহলে আমাদের মৃত্যু ১০০% নিশ্চিত, লাশও পাওয়া যাবে না।" এই উপলব্ধি থেকে ২৮ জুলাই সব অংশীজনের (ছাত্রদল, ছাত্রশিবির ও অন্যান্য সংগঠন) সঙ্গে আলোচনা করে ঢাকার ৮টি গুরুত্বপূর্ণ স্পটে নতুন করে বিক্ষোভ কর্মসূচির ঘোষণা দেন সমন্বয়ক আব্দুল কাদের।

সরকারের হিসাব এবং গণক্ষোভের বিস্ফোরণ ২৮ জুলাই তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল আন্দোলন ঘিরে সহিংসতায় ১৪৭ জনের মৃত্যুর সরকারি তথ্য প্রকাশ করেন। তবে বাস্তবে নিহতের সংখ্যা ছিল এর চেয়ে বহুগুণ বেশি।

ডিবি কার্যালয়ে আটক অবস্থায় জোরপূর্বক এই স্বীকারোক্তি আদায়ের ঘটনা জনমনে ভয়ের বদলে উল্টো তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার করে। এই নাটকীয়তা ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনকে আরও ত্বরান্বিত করে তোলে। যার প্রমাণ পাওয়া যায় ৫ আগস্ট স্বৈরাচারের পতনের পর, যখন বিক্ষুব্ধ জনতা ডিবি কার্যালয়ের সামনের দেয়ালে তীব্র উপহাস করে লিখে দেয়—"হারুনের ভাতের হোটেল"।

উপসংহার ২৮ জুলাইয়ের ঘটনা প্রমাণ করে যে, একটি ন্যায্য ও স্বতঃস্ফূর্ত গণআন্দোলনকে শীর্ষ কয়েকজনকে বন্দি করে বা জোরপূর্বক বিবৃতি আদায় করে থামানো যায় না। সরকারের সেই ভুল চালই মূলত তাদের পতনের পথকে আরও প্রশস্ত করেছিল।


Comments (0)

Login to leave a comment.

No comments yet. Be the first to comment.


Related posts