ছাত্রদের রক্ত বনাম বিটিভির দেয়াল: ২৪-এর আন্দোলনে যেভাবে দুই ভাগে তারকাদের বিভক্ত অবস্থান
ঢাকা — ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান কেবল রাজপথ বা ক্যাম্পাসের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; এর ঢেউ আছড়ে পড়েছিল দেশের বিনোদন ও সংস্কৃতি অঙ্গনেও। তবে এই আন্দোলনকে ঘিরে দেশের শোবিজ অঙ্গনের তারকারা স্পষ্টভাবে দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিলেন। একদল তারকা ক্যারিয়ারের ঝুঁকি নিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর নির্বিচার গুলির প্রতিবাদে রাজপথে নেমেছিলেন। অন্যদিকে, আরেকদল তারকা রাষ্ট্রীয় বয়ানের সাথে সুর মিলিয়ে রাষ্ট্রীয় স্থাপনা ধ্বংসের প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছিলেন।
শিক্ষার্থীদের পক্ষে তারকাদের অবস্থান আন্দোলনের চরম উত্তেজনাকর দিনগুলোতে একটি বৃহস্পতিবার রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় শিক্ষার্থীদের পক্ষে সরাসরি রাস্তায় নামেন মোশাররফ করিম, সিয়াম আহমেদ, জাকিয়া বারী মম, আজমেরী হক বাঁধন, সাবিলা নূর ও মিথিলার মতো জনপ্রিয় তারকারা। তাদের একটাই দাবি ছিল—"আর যেন কোনো ছাত্রের বুকে গুলি না চলে।"
এর এক দিন পরই শনিবার বিকেলে ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে ‘গেটআপ স্ট্যান্ডআপ’ স্লোগানে জড়ো হন দেশের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পীরা। সেখানে ঘণ্টাখানেক অবস্থানের পর ছাত্র-জনতাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে সাথে নিয়ে তারা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের দিকে পদযাত্রা করেন। শিল্পীরা প্রতিটি হত্যার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন এবং গ্রেপ্তার হওয়া ছাত্র ও মিউজিশিয়ানদের মুক্তির আওয়াজ তোলেন।
সেখানে এক শিল্পী নিহত মীর মুগ্ধকে স্মরণ করে আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, "আমার কানে এখনো বাজে—কারো পানি লাগবে? কত পানি আসছে এখন, কারো পানি লাগবে! এটা যতদিন মাথায় থাকবে, ততদিন পর্যন্ত আমরা শান্তিতে ঘুমাতে পারব না।"
বিটিভির ধ্বংসস্তূপে আরেক দল তারকার কান্না ফার্মগেটে যখন একদল তারকা ছাত্রদের হত্যার প্রতিবাদ করছিলেন, ঠিক একই সময়ে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম বিটিভি কার্যালয়ে জড়ো হন ফেরদৌস, সাজু খাদেম, অঞ্জনা, তারিন, শমী কায়সারসহ আওয়ামী লীগপন্থি অভিনয়শিল্পী ও নির্মাতারা। তারা সেখানে গিয়ে বিটিভির পোড়া ভবন দেখে মর্মাহত হন এবং জ্বালাও-পোড়াওয়ের তীব্র নিন্দা জানান।
তাদের বক্তব্য ছিল, ছাত্রদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কোনো ‘তৃতীয় পক্ষ’ বা ‘মানুষরূপী পশু’ ঢুকে এই আন্দোলনকে নস্যাৎ করে দিয়েছে এবং পুরো দেশকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছে।
একই সুরে বিএফডিসির সামনে ‘আমরা সর্বদাই শান্তির পক্ষে’ স্লোগানে মানববন্ধন করে সম্মিলিত চলচ্চিত্র পরিষদ। তারা এই সহিংসতাকে তৃতীয় পক্ষের নাশকতা আখ্যা দিয়ে অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানান, "আপনারা আপনাদের সন্তানকে ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে যান। কারও উসকানিতে আমরা সামনে আসব না।"
উপসংহার জুলাইয়ের সেই উত্তাল দিনগুলোতে তারকাদের এই দুই মেরুর অবস্থান সাধারণ মানুষের কাছে তাদের প্রিয় শিল্পীদের আসল রূপ উন্মোচন করেছিল। যারা সেদিন রক্তস্নাত শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তারা আজ গণমানুষের ভালোবাসায় সিক্ত। আর যারা সেদিন লাশের বদলে বিটিভির দেয়াল বা মেট্রোরেল নিয়ে বেশি চিন্তিত ছিলেন, ছাত্র-জনতার বিজয়ের পর তাদের অনেকেই আজ আত্মগোপনে বা জনরোষের মুখে পড়েছেন।
Comments (0)
Login to leave a comment.
No comments yet. Be the first to comment.
Related posts
জুলাই আন্দোলন
‘পুলিশের পায়ে এখন পলায়নপর দশা’: ৪ আগস্ট কুষ্টিয়ায় ছাত্র-জনতার ঝটিকা আক্রমণে থানা ও পার্টি অফিস ঘেরাও
জুলাই আন্দোলন
৪ আগস্ট: নেত্রকোনার রাজপথে লাঠিসোঁটা হাতে তারুণ্যের ঢল, ধাওয়া খেল পুলিশ
জুলাই আন্দোলন