36July
জুলাই আন্দোলন

‘৩৩ জুলাই’ উত্তপ্ত রাজপথ: সন্তানের বুকে বন্দুকের নল, রক্ষায় ঢাল হয়ে মাঠে নামল গোটা জাতি

by Ataullah Rahman Polas · · 23 views
‘৩৩ জুলাই’ উত্তপ্ত রাজপথ: সন্তানের বুকে বন্দুকের নল, রক্ষায় ঢাল হয়ে মাঠে নামল গোটা জাতি

ঢাকা — ২ আগস্ট ২০২৪, বা আন্দোলনকারীদের ক্যালেন্ডারে ‘৩৩ জুলাই’। ততদিনে শোক পরিণত হয়েছে তীব্র ক্ষোভে এবং গোটা জাতি হারিয়ে ফেলেছে ধৈর্য। আন্দোলন তখন আর শুধু কোটা সংস্কার বা কেবল শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। শেখ হাসিনার গড়া রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বন্দুকের নল যখন দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দিকে তাক করা, তখন সন্তানতুল্য শিক্ষার্থীদের রক্ষায় বুক চিতিয়ে রাজপথে নেমে আসেন অভিভাবক, শিক্ষক, শিল্পী সমাজসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। গোটা দেশে তখন বিরাজ করছিল এক যুদ্ধ-যুদ্ধ পরিস্থিতি।


সমন্বয়কদের মুক্তি ও নতুন উদ্যম এর ঠিক এক দিন আগেই ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজত থেকে মুক্তি পান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ক। মুক্তি পেয়েই তারা স্পষ্ট বার্তা দেন—জোরপূর্বক আন্দোলন প্রত্যাহারের বিবৃতি আদায় করা হয়েছিল, তবে আন্দোলন চলবে। যদিও দীর্ঘক্ষণ ডিবি হেফাজতে থাকার কারণে শুরুতে তাদের নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে কিছুটা সংশয় ছিল, তবুও রাজপথে থাকা ছাত্র-জনতা এই বার্তায় দ্বিগুণ সাহসে উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে।


বৃষ্টি উপেক্ষা করে রাজপথে শিক্ষক-অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের মূল স্রোতে ততদিনে ব্যাপক গতি এনে দিয়েছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীরা। ২ আগস্ট সকালে সব বন্দীর মুক্তি এবং হত্যার বিচারের দাবিতে রাজুক উত্তরা মডেল কলেজের সামনে থেকে শুরু হয় গণমিছিল। মুষলধারে বৃষ্টিতে ভিজেই সেদিন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গলা মেলান অভিভাবক ও শিক্ষকরা। তারা বুক চাপড়ে বলতে থাকেন, "তোমরা তোমাদের আন্দোলন চালিয়ে যাও।"

প্রগতি সরণিতেও ধ্বনিত হতে থাকে ব্র্যাক ও ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আগুনঝরা স্লোগান। বৃষ্টি উপেক্ষা করে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রতিবাদ সমাবেশ করেন মেডিকেল কলেজের ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষকরা। অন্যদিকে, বায়তুল মোকাররম থেকেও সাধারণ জনতার বিশাল গণমিছিল বের হয়, যাদের মুখে ছিল কেবল হত্যার বিচার এবং ৯ দফার বাস্তবায়নের দাবি।


উত্তরা যেন রণক্ষেত্র, পিছপা হয়নি তারুণ্য এদিকে, উত্তরায় ১১ নম্বর সেক্টর তখন আক্ষরিক অর্থেই পরিণত হয় রণক্ষেত্রে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে মাঠে নামা আন্দোলনকারীদের ওপর একযোগে আক্রমণ চালায় ছাত্রলীগ ও পুলিশ। পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেলের ধোঁয়ার মাঝেই চলতে থাকে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। কিন্তু বুকভরা সাহস নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নিরস্ত্র সাধারণ ছাত্রদের কোনোমতেই দমাতে পারেনি প্রশিক্ষিত ও ভারী অস্ত্রে সজ্জিত পুলিশ বাহিনী।


শিল্পীদের প্রতিবাদ এবং ‘দ্রোহ যাত্রা’ ততদিনে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি ধৈর্য হারিয়েছেন দেশের শিল্পীরাও। ২ আগস্ট বেলা ১১টা থেকে ধানমন্ডির সাতমসজিদ রোডে প্রতিবাদ সমাবেশ করে শিল্পী সমাজ। গান, কবিতা আর পথনাটকের মাধ্যমে তারা ছাত্র হত্যার তীব্র প্রতিবাদ জানান।

একই দিন বেলা ৩টায় জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে ঐতিহাসিক ‘দ্রোহ যাত্রা’র ডাক দেন শিল্পী, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা। প্রেস ক্লাব থেকে শুরু হয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে শেষ হয় এই বিশাল যাত্রা। যেখানে অংশ নেন হাজারো সাধারণ মানুষ। ড্রোহ যাত্রার পথে পথে রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ পথচারীরা হাততালি দিয়ে তাদের সমর্থন জানান। আন্দোলনকারীদের কৌশল ছিল—সাংস্কৃতিক কর্মী, শিক্ষক ও বিশিষ্ট নাগরিকরা সামনে থাকলে পুলিশ সহজে গুলি চালাতে পারবে না।


উপসংহার শুধু ঢাকা নয়, সেদিন ফেনী, খুলনা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের প্রতিটি প্রান্তেই গড়ে উঠেছিল এক অভূতপূর্ব প্রতিরোধ। একপাশে ভারী অস্ত্রে সজ্জিত রাষ্ট্রীয় বাহিনী, অন্যদিকে খালি হাতে বুক পেতে দাঁড়িয়ে থাকা নিরস্ত্র তারুণ্য। ২ আগস্টের এই স্বতঃস্ফূর্ত গণজাগরণই প্রমাণ করে দিয়েছিল যে, কোটা আন্দোলন এবার সত্যিকার অর্থেই এক অপ্রতিরোধ্য গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিয়েছে।


Comments (0)

Login to leave a comment.

No comments yet. Be the first to comment.


Related posts