২৯ জুলাই: ডিবির ‘মস্করা’র কড়া জবাব হাইকোর্টে, বন্দুকের নল এড়িয়ে রাজপথে দুর্বার ছাত্র-জনতা
ঢাকা — ২৪-এর রক্তাক্ত জুলাইয়ের দিনলিপিতে ২৯ জুলাই ছিল এক চরম নাটকীয়তা ও ঘুরে দাঁড়ানোর দিন। আগের দিন ডিবি হেফাজতে থাকা ছয় সমন্বয়ককে দিয়ে জোরপূর্বক ‘আন্দোলন প্রত্যাহার’-এর ভিডিও বার্তা আদায় করেছিল তৎকালীন সরকার। তারা ভেবেছিল এতেই থেমে যাবে আন্দোলন। কিন্তু জেনারেশন জি (Gen-Z) ঠিকই বুঝেছিল এই ঘোষণার পেছনের সত্য। তাই পরদিন ২৯ জুলাই বন্দুকের নল, কঠোর কারফিউ আর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ‘আমার ভাই মরল কেন, জবাব চাই’ স্লোগানে আবারও রাজপথে নেমে আসে শিক্ষার্থীরা।
কারফিউ ভেঙে রাজপথে উত্তাল ছাত্র-জনতা ২৮ জুলাই রাতে বাইরে থাকা সমন্বয়করা ডিবি হেফাজত থেকে দেওয়া আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণাকে প্রত্যাখ্যান করে দেশব্যাপী বিক্ষোভের ডাক দেন। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে ২৯ জুলাই সকাল থেকেই ঢাকা শহরের সায়েন্সল্যাব, ইসিবি চত্বর, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পয়েন্টে জড়ো হতে থাকেন শিক্ষার্থীরা। সেদিন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ভেদাভেদ ছিল না।
শুধু ঢাকা নয়—চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, সিলেট, নোয়াখালী, রাজশাহী এবং বরিশালেও সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসেন। বিভিন্ন স্থানে পুলিশ, র্যাব ও ছাত্রলীগের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। পুলিশ এদিনও সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল ছুড়ে আন্দোলনকারীদের দমানোর চেষ্টা করে এবং রাজধানী থেকে অন্তত ৫০ জনের বেশি শিক্ষার্থীকে আটক করে।
শিক্ষকদের যোগদান ও গণতদন্ত কমিশন গঠন শিক্ষার্থীদের এই যৌক্তিক আন্দোলনের সঙ্গে এদিন প্রকাশ্যে সংহতি জানান বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও। তারা এক হয়ে সমাবেশ করেন। এদিনই রংপুরে শহীদ আবু সাঈদের বুকে গুলি ছোড়ার ঘটনায় পুলিশ সাধারণ মানুষকে দোষারোপ করলে এবং নিহতের সংখ্যা নিয়ে সরকারের বিভ্রান্তিকর তথ্যের প্রতিবাদে আইনজীবী ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা মিলে ‘জাতীয় গণতদন্ত কমিশন’ গঠন করেন।
হাইকোর্টে রিট ও ডিবিকে ‘মস্করা’র তোপ ২৯ জুলাইয়ের অন্যতম বড় ঘটনা ছিল আদালতের বিচারিক লড়াই। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ককে ডিবি হেফাজত থেকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়া এবং আন্দোলনকারীদের ওপর আর গুলি না চালানোর নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন সুপ্রিম কোর্টের কয়েকজন আইনজীবী।
শুনানিকালে ডিবি কার্যালয়ে ছয় সমন্বয়ককে তুলে নিয়ে ডাইনিং টেবিলে বসিয়ে খাওয়ানোর ছবি প্রকাশ করার বিষয়ে হাইকোর্ট চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন। আদালত মন্তব্য করেন, "হাতের টেবিলে বসাইয়া ছবি তুইলা এটা করেন, আপনি কি এটা মস্করা পাইছেন?" এদিকে, তীব্র সমালোচনার মুখে ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদ দাবি করেন, সমন্বয়করা জোরপূর্বক নয়, নিজ ইচ্ছাতেই বিবৃতি দিয়েছেন।
গণভবনে ১৪ দলের বৈঠক ও লাল কাপড়ের ডাক পরিস্থিতি হাতছাড়া হতে দেখে ২৯ জুলাই সন্ধ্যায় তড়িঘড়ি করে ১৪ দলের সঙ্গে গণভবনে বৈঠকে বসেন শেখ হাসিনা। তিনি গোটা আন্দোলনকে সরাসরি ‘জঙ্গিবাদী কাজ’ বলে অভিহিত করেন এবং আন্দোলনে জামায়াত-শিবিরের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে তাদের নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নেন। শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে বিভিন্ন হল থেকে বিতাড়িত ছাত্রলীগ নেত্রীদের সঙ্গেও এদিন গণভবনে শেখ হাসিনার ‘কান্না পর্ব’ চলে।
সরকার সহিংসতায় নিহতদের স্মরণে পরদিন (৩০ জুলাই) দেশব্যাপী শোক পালনের ঘোষণা দেয়। তবে ছাত্র-জনতা এই ‘লোক দেখানো শোক’ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে। এর বদলে ৯ দফা বাস্তবায়নের দাবিতে ৩০ জুলাই একক ও ঐক্যবদ্ধভাবে মুখে ও চোখে লাল কাপড় বেঁধে ছবি তোলা এবং অনলাইনে প্রচার কর্মসূচির ডাক দেন সমন্বয়করা। ৯ দফার প্রথম দাবিই ছিল—ছাত্র-নাগরিক হত্যার দায় স্বীকার করে শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে।
উপসংহার ২৯ জুলাইয়ের রাজপথের এই প্রতিরোধই প্রমাণ করেছিল, বন্দুকের জোরে আর জিম্মি করে কোনো গণআন্দোলন দমিয়ে রাখা যায় না। সমন্বয়কদের অনুপস্থিতিতেই সেদিন সাধারণ শিক্ষার্থী ও জনতা যেভাবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলন এগিয়ে নিয়েছিল, তাতেই মূলত স্বৈরাচারী সরকারের চূড়ান্ত পতনের পথ প্রশস্ত হয়েছিল।
Comments (0)
Login to leave a comment.
No comments yet. Be the first to comment.
Related posts
জুলাই আন্দোলন
‘পুলিশের পায়ে এখন পলায়নপর দশা’: ৪ আগস্ট কুষ্টিয়ায় ছাত্র-জনতার ঝটিকা আক্রমণে থানা ও পার্টি অফিস ঘেরাও
জুলাই আন্দোলন
৪ আগস্ট: নেত্রকোনার রাজপথে লাঠিসোঁটা হাতে তারুণ্যের ঢল, ধাওয়া খেল পুলিশ
জুলাই আন্দোলন