36July
জুলাই আন্দোলন

১৫ জুলাই: ঢাবিতে রক্তাক্ত শিক্ষার্থীদের নতুন কর্মসূচি ও নাহিদ ইসলামের সেই আল্টিমেটাম

by Ataullah Rahman Polas · · 18 views
১৫ জুলাই: ঢাবিতে রক্তাক্ত শিক্ষার্থীদের নতুন কর্মসূচি ও নাহিদ ইসলামের সেই আল্টিমেটাম

ঢাকা — "এই আন্দোলন আর শুধু ছাত্রদের আন্দোলন নেই। সরকারের সর্বোচ্চ জায়গা থেকে উসকানি দিয়ে যখন আন্দোলন দমনের চেষ্টা করা হয়েছে, তখন সাধারণ মানুষকেও এই আন্দোলনে নেমে আসতে হবে।"

২০২৪ সালের ১৫ জুলাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে অন্যতম একটি মর্মান্তিক ও কালো দিন। কোটা সংস্কারের যৌক্তিক দাবিতে আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর সেদিন বাসে-ট্রাকে করে আনা বহিরাগত ‘টোকাই’ ও ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের সশস্ত্র ক্যাডাররা পৈশাচিক হামলা চালায়। নারী শিক্ষার্থীদের ওপর নজিরবিহীন বর্বরোচিত এই হামলার পর পুরো ক্যাম্পাস যখন রক্তে ভাসছে, ঠিক সেই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে স্বৈরাচারী ব্যবস্থার ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া এক ডাক দিয়েছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা।


ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের নারকীয় তাণ্ডব ও প্রশাসনের নীরবতা সেদিন ক্যাম্পাসের প্রতিটি মোড়ে রড, চাপাতি ও ইটপাটকেল নিয়ে হামলা চালানো হয়েছিল। চ্যানেল ২৪-এর ফুটেজে দেখা যায়, ক্ষুব্ধ এক সমন্বয়ক প্রশাসনের তীব্র সমালোচনা করে বলছেন, "যে ভিসি এবং প্রক্টর আমার বোনদের নিরাপত্তা দিতে পারেননি, আমরা অতি দ্রুত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেব।"

সেদিন দুই শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন, যাদের মধ্যে ২০-২৫ জনের অবস্থা ছিল অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। সাধারণ শিক্ষার্থীরা নিজেদের আইডি কার্ড দেখিয়েও শহীদ মিনারে যেতে পারছিলেন না, অথচ বহিরাগত সন্ত্রাসীরা পুরো ক্যাম্পাসে ত্রাস সৃষ্টি করে বেড়াচ্ছিল। সমন্বয়করা স্পষ্ট হুংকার দিয়ে বলেন, "এই টোকাইদের ঠিকানা এই ক্যাম্পাসে হবে না। সন্ত্রাসীদের ঠিকানা এই ক্যাম্পাসে হবে না।"


প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাখ্যান ও ‘রাজাকার’ স্লোগানের নেপথ্য সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম সেদিন সরাসরি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যের কড়া জবাব দেন। তিনি বলেন, "প্রধানমন্ত্রী হয়ে তিনি যৌক্তিক সমাধানের পথ দেখাবেন, তা না করে আন্দোলনকারীদের প্রতি যে কটূক্তি করেছেন, রাজাকারের নাতি বলে ইঙ্গিত করেছেন—তা চরম নিন্দনীয়।"

নাহিদ ইসলাম স্পষ্ট করেন যে এই আন্দোলনের সাথে ‘রাজাকার’ শব্দের কোনো সম্পর্ক ছিল না। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীই এই শব্দের সূত্রপাত ঘটিয়েছিলেন, যার পাল্টা জবাব হিসেবে ছাত্ররা বলেছিল—"আমি নই, তুমি নও, রাজাকার রাজাকার।" আন্দোলনের মূলমন্ত্র ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা—সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক সুবিচার।


সর্বস্তরের মানুষের প্রতি রাজপথে নামার আহ্বান ১৫ জুলাইয়ের এই নারকীয় হামলার পরই মূলত কোটা সংস্কার আন্দোলন একটি বৃহত্তর গণ-আন্দোলনে রূপ নিতে শুরু করে। নাহিদ ইসলাম সেদিন স্কুল, কলেজ, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়সহ সর্বস্তরের সাধারণ মানুষকে একযোগে রাজপথে নেমে আসার আহ্বান জানান। তিনি ঘোষণা করেন, পরদিন বিকেল ৩টায় সারা দেশের সকল ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে এবং এরপর দেশজুড়ে অবরোধ কর্মসূচি চলবে।


হলে হলে প্রতিরোধের ডাক হামলার শিকার শিক্ষার্থীরা যেন ভয়ে পিছিয়ে না যান, সে জন্য সমন্বয়করা প্রতিটি হলে প্রতিরোধ গড়ে তোলার নির্দেশ দেন। তারা বলেন, "এই হল শিক্ষার্থীদের। কোনো অছাত্র, কোনো সন্ত্রাসীর জায়গা এখানে হবে না। যেসব সন্ত্রাসী আজ আঘাত করেছে, তাদের কোনোভাবেই হলে ঢুকতে দেওয়া হবে না।" শহীদুল্লাহ হল, ফজলুল হক হলসহ বেশ কয়েকটি হলে সেদিন সাধারণ শিক্ষার্থীরা রুখে দাঁড়িয়েছিলেন।


উপসংহার ১৫ জুলাইয়ের সেই রক্তাক্ত বিকেলে সমন্বয়কদের দেওয়া এই ঘোষণাই মূলত পুরো বাংলাদেশের দৃশ্যপট বদলে দিয়েছিল। বহিরাগতদের হামলা ও রাষ্ট্রীয় রক্তচক্ষুকে ভয় না পেয়ে তারা যে বৃহত্তর গণ-আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন, তা-ই পরবর্তীতে ৫ আগস্টের চূড়ান্ত বিজয় নিশ্চিত করেছিল।


Comments (0)

Login to leave a comment.

No comments yet. Be the first to comment.


Related posts