যেখান থেকে শুরু হয়েছিল ইতিহাসের মোড় ঘোরানো গণঅভ্যুত্থান
ঢাকা — "৩৬ জুলাই" এখন বাংলাদেশের মানুষের কাছে একটি সুপরিচিত শব্দ। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই মাস যখন শুরু হয়েছিল, তখন কেউ হয়তো ভাবতেও পারেনি যে এই মাসের ঘটনাপ্রবাহ দেশের ইতিহাসের গতিপথকে চিরতরে বদলে দেবে। সরকারি চাকরিতে কোটা প্রথা বাতিলের দাবিতে শুরু হওয়া একটি অরাজনৈতিক ছাত্র আন্দোলন কীভাবে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের 'এক দফা' দাবিতে রূপ নেয়, তার বীজ বোনা হয়েছিল এই ১ জুলাইতেই।
প্রেক্ষাপট: ২০১৮ থেকে ২০২৪ ১৯৭২ সাল থেকে চলে আসা বৈষম্যমূলক কোটা পদ্ধতির সংস্কার চেয়ে ২০১৮ সালে ব্যাপক আন্দোলন হয়। সেই আন্দোলনের মুখে ক্ষুব্ধ হয়ে শেখ হাসিনা সরকার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বাতিল করে। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ জুন আদালতের মাধ্যমে সেই কোটা ব্যবস্থা আবারও বহাল করা হয়। এর প্রতিবাদে ৬ জুন ও ৯ জুন বিক্ষোভ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এবং দাবি পূরণে ৩০ জুন পর্যন্ত আল্টিমেটাম দেয়।
১ জুলাই: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আত্মপ্রকাশ ও লাগাতার কর্মসূচি ঈদের ছুটির পর ১ জুলাই থেকে টানা কর্মসূচি শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। এদিন তারা ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ নামে একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম গঠন করেন। বেলা ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার থেকে মিছিল শুরু হয়ে রাজু ভাস্কর্যে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে আন্দোলনকারীরা ৩ ও ৪ জুলাইয়ের জন্য কর্মসূচি ঘোষণা করেন এবং ৪ জুলাইয়ের মধ্যে কোটা সমস্যার চূড়ান্ত সমাধানের আহ্বান জানান।
এদিন শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন। পাশাপাশি চট্টগ্রাম, জগন্নাথ, বরিশাল ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সেসময় শিক্ষকদের ‘প্রত্যয়’ পেনশন স্কিম বাতিলের দাবিতে কর্মবিরতি চলমান থাকায় শিক্ষার্থীদের ক্লাস-পরীক্ষার চাপ ছিল না, যা এই আন্দোলনে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রাখে।
আন্দোলন দমাতে সরকারের হাতিয়ার: ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট জুলাইয়ের দিনগুলো যত গড়াতে থাকে, আন্দোলন তত তীব্র হতে থাকে। এক পর্যায়ে আন্দোলন দমাতে শেখ হাসিনা সরকার ইন্টারনেটকে হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেয়। প্রথমে হোয়াটসঅ্যাপ ও ইমেইলের মাধ্যমে নির্দেশ দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও শাহবাগ এলাকাসহ পাঁচটি স্থানে, এরপর ৫৫টি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এবং শেষে পুরো দেশেই ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট করা হয়।
তৎকালীন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক তখন দাবি করেছিলেন, মহাখালীর খাজা টাওয়ারের ডেটা সেন্টারে আগুন এবং ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্কে নাশকতার কারণে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি বলেছিলেন, "আমরা ইন্টারনেট বন্ধ করিনি, ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে গেছে।"
তবে পরবর্তীতে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে এই দাবির সত্যতা মিথ্যা প্রমাণিত হয়। প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয় যে, খাজা টাওয়ারের ডেটা সেন্টারে আগুন লাগার সাথে দেশব্যাপী ইন্টারনেট বন্ধ হওয়ার কোনো সম্পর্ক ছিল না। মূলত প্রশাসনিক নির্দেশনায়, বিশেষ করে তৎকালীন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী পলকের মৌখিক নির্দেশনায় এবং একটি নির্দিষ্ট হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে সুপরিকল্পিতভাবে এই ইন্টারনেট শাটডাউন করা হয়েছিল।
Comments (0)
Login to leave a comment.
No comments yet. Be the first to comment.
Related posts
জুলাই গণঅভ্যুত্থান ডকুমেন্টারি
জুলাই গণঅভ্যুত্থান
‘আংশিক বিজয়কে পূর্ণাঙ্গ করতে হবে’: ৫ আগস্ট বিকেলে ছাত্র-জনতাকে রাজপথে থাকার নির্দেশ
জুলাই গণঅভ্যুত্থান