‘৩৬ জুলাই’ বা ৫ আগস্ট: ছাত্র-জনতার দ্রোহের আগুনে যেদিন ছাই হলো ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদ
ঢাকা — অগ্নিগর্ভ জুলাইয়ের ৩৬তম দিন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। দেশজুড়ে তখন চলছিল জরুরি অবস্থা ও অনির্দিষ্টকালের কারফিউ। সকাল থেকেই রাজধানী ঢাকার পরিবেশ ছিল থমথমে। কিন্তু বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই যেন আগ্নেয়গিরির মতো জেগে ওঠে পুরো বাংলাদেশ। ১৪৪ ধারা ও কারফিউ ভেঙে রাজধানীর সব প্রবেশপথ দিয়ে ঢাকায় ঢুকতে শুরু করে ছাত্র-জনতা। সব বাধা আর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে গণভবন অভিমুখে যখন লাখো জনতার ঢল নামে, তখনই দুপুর নাগাদ খবর আসে—দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে গেছেন স্বৈরাচারী শাসক শেখ হাসিনা। আর এর মাধ্যমেই পতন ঘটে টানা ১৭ বছর ধরে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা আওয়ামী ফ্যাসিবাদের।
উত্তরায় সেনাবাহিনীর তিন স্তরের বলয় ভেদ ৫ আগস্ট সকাল থেকেই রাজধানীর উত্তরা ছিল অন্যতম এক উত্তপ্ত জনপদ। উত্তরার বিএনএস সেন্টারের সামনের ফুটওভার ব্রিজটি হয়ে উঠেছিল স্বৈরাচার ও জনতার মাঝখানের সীমানা। সেখানে সেনাবাহিনীর তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয়, কাঁটাতারের বেড়া, সাঁজোয়া যান এবং বেশ কয়েকটি ট্যাঙ্ক মোতায়েন ছিল।
বিপরীত পাশে রাজুক মডেল কলেজ, মাসকট প্লাজা ও আব্দুল্লাহপুর এলাকা থেকে লাখ লাখ মানুষ এসে জমায়েত হয়। উত্তেজনা প্রশমনে সেনাবাহিনীর তরফ থেকে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়া হলে জনতা আরও বেশি উত্তেজিত হয়ে ওঠে এবং সামনের দিকে এগোতে থাকে। একপর্যায়ে সেনাবাহিনী ও ছাত্র-জনতা একেবারের মুখোমুখি এসে দাঁড়ালে, জনতার শক্তির কাছে পিছু হটতে বাধ্য হয় সেনাবাহিনী। ব্যারিকেড ভেঙে লাখ লাখ মানুষ রওয়ানা হয় গণভবনের দিকে।
সাভারের বীভৎসতা ও যাত্রাবাড়ীর রক্তক্ষয়ী প্রতিরোধ জুলাই জুড়েই সাভার, আশুলিয়া ও গাবতলী এলাকা ছিল আন্দোলনের অন্যতম হটস্পট। ৫ আগস্ট আশুলিয়া থানার আশপাশের এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর ব্যাপক গুলিবর্ষণ করা হয়। সেখানে কয়েকটি মরদেহ একটি ভ্যানে স্তূপ করে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার মতো বীভৎস ও অমানবিক দৃশ্য দেশজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। এত লাশের পাহাড় ডিঙিয়েই সাভারের জনতা সেদিন রাজধানীতে প্রবেশ করেছিল।
অন্যদিকে, শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবরে সারা দেশে যখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পিছু হটতে শুরু করে, তখন ব্যতিক্রম ছিল কেবল যাত্রাবাড়ী। সেখানে থানার সামনে সাধারণ মানুষ অবস্থান নিলে পুলিশ তখনো নির্বিচারে জনতার ওপর গুলিবর্ষণ অব্যাহত রাখে ।
গণভবন দখল এবং ১৭ বছরের ক্ষোভের বিস্ফোরণ দুপুরের পর শাহবাগসহ রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখ লাখ ছাত্র-জনতা স্রোতের মতো আছড়ে পড়ে গণভবন ও সংসদ ভবন এলাকায়। দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে গুম, খুন, আর নির্যাতনের সব নির্দেশ আসতো লাল ইটের এই গণভবন থেকে। ফলে ৫ আগস্ট সেই ভবনের প্রতিটি পরতে পরতে মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে।
গণভবন এবং সংসদ ভবনে ভাঙচুর চালানোর পাশাপাশি মানুষ স্বৈরশাসকের বিদায়ের আনন্দে উল্লাসে মেতে ওঠে। পুরো দেশের মানুষ যেন সেদিন এক নতুন মুক্তির স্বাদ পেয়েছিল।
নতুন অধ্যায়ের সূচনা ৫ আগস্ট বিকেলে শেখ হাসিনার পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন সেনাপ্রধান। এরপর ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতির সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর একের পর এক বৈঠক এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সবশেষে ৮ আগস্ট শপথ নেয় নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। মাত্র কয়েকদিনের এই অভাবনীয় গণঅভ্যুত্থানে পুরোপুরি বদলে যায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, সূচনা হয় এক নতুন অধ্যায়ের।
Comments (0)
Login to leave a comment.
No comments yet. Be the first to comment.
Related posts
জুলাই গণঅভ্যুত্থান ডকুমেন্টারি
জুলাই গণঅভ্যুত্থান
‘আংশিক বিজয়কে পূর্ণাঙ্গ করতে হবে’: ৫ আগস্ট বিকেলে ছাত্র-জনতাকে রাজপথে থাকার নির্দেশ
জুলাই গণঅভ্যুত্থান