জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যেভাবে স্লোগান হয়ে উঠেছিল বিপ্লবের বুলেট
ঢাকা — "স্লোগান কাগজ কলমের কার্তুজ নয়, স্লোগান জন্ম নেয় রাজপথে, মিছিলে, অগণিত পায়ের শব্দে আর সিনা টান করা বুকে।" ২৪-এর জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পরতে পরতে যেন মিশে আছে এই কথাটির সত্যতা। মাত্র ৩৬ দিনের আন্দোলনে বাংলাদেশের রাজপথ কেঁপেছে শত-সহস্র স্লোগানে। এই স্লোগানগুলো কেবল কয়েকটি শব্দের সমষ্টি ছিল না; এগুলো ছিল মানুষের ক্ষোভ, দ্রোহ, অধিকার আদায়ের স্পৃহা এবং দীর্ঘ ১৬ বছরের জমাট বাঁধা বেদনার এক চূড়ান্ত ও বারুদ-ঠাসা বিস্ফোরণ।
শুরুটা ছিল অহিংস: 'কোটা না মেধা' আন্দোলনের প্রথম দিকে দাবি ছিল সোজা-সাপ্টা, আর স্লোগানও ছিল সরল। ৫ জুন হাইকোর্টের আদেশে কোটা পদ্ধতি পুনর্বহাল হলে ৯ জুন পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের মুখে মুখে ফিরত—"কোটা না মেধা, মেধা মেধা।" এরপর ১ জুলাই থেকে যখন আন্দোলন বেগবান হয়, তখনো "আমার সোনার বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই"-এর মতো সরল কিন্তু শক্ত স্লোগানের মাধ্যমে পুরো বাংলাদেশকে বোঝানো হয়েছিল যে এই আন্দোলনের লক্ষ্য কেবল চাকরি নয়, বরং সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা বৈষম্য দূর করা।
'রাজাকার' কটাক্ষ এবং স্লোগানের বাঁকবদল আন্দোলন চলাকালে ১৪ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন আন্দোলনকারীদের 'রাজাকারের নাতিপুতি' বলে কটাক্ষ করেন, তখন স্লোগানের ভাষা ও চরিত্র সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। ক্ষোভে ফুঁসে ওঠা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মধ্যরাতে গর্জে ওঠেন—"তুমি কে, আমি কে? রাজাকার, রাজাকার! কে বলেছে, কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার!"
এই একটি স্লোগানই স্বৈরাচারের ভিত্তিমূল নাড়িয়ে দেয়। এর মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা বুঝিয়ে দেন যে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে কুক্ষিগত করে এবং ভিন্নমতকে 'রাজাকার' ট্যাগ দিয়ে দমনের যে নোংরা রাজনীতি, তা এ দেশের তরুণ সমাজ আর মেনে নেবে না।
রক্তের বিনিময়ে দ্রোহের স্লোগান ১৬ জুলাই রংপুরে পুলিশের বুলেটের সামনে বুক পেতে দেওয়া আবু সাঈদের মহাকাব্যিক মৃত্যু আন্দোলনের ভাষাকে করে তোলে আরও তীব্র ও শ্লেষাত্মক। এরপর থেকেই রাজপথে অনুরণিত হতে থাকে—"বুকের ভেতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর", "আমার টাকায় আমার কেনা, আমার বুকেই মারলি গুলি", "তোর কোটা তুই নে, আমার ভাই ফিরিয়ে দে!"
পুলিশ, র্যাব আর বিজিবির নির্বিচার গুলির মুখে নিরস্ত্র মানুষের একমাত্র অস্ত্র হয়ে উঠেছিল এই স্লোগানগুলো। আপসের পথ বন্ধ করে তারা জানিয়ে দিয়েছিল—"আপস না সংগ্রাম? সংগ্রাম, সংগ্রাম", "দালালি না রাজপথ? রাজপথ, রাজপথ।"
'বিকল্প' বয়ানের পতন এবং দিল্লির আধিপত্যের বিরুদ্ধে গর্জন গত ১৬ বছর ধরে শেখ হাসিনা সরকারের একটি বয়ান ছিল যে, "শেখ হাসিনার কোনো বিকল্প নেই।" কিন্তু ২৫ জুলাইয়ের পর থেকে সেই মিথ ভেঙে পড়ে। রাজপথে স্লোগান ওঠে—"তুমি কে, আমি কে? বিকল্প, বিকল্প!" এর মাধ্যমে সামন্তবাদী মানসিকতার বাইরে গিয়ে একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা ফুটে ওঠে।
একইভাবে, ভারতের আধিপত্যবাদী নীতির বিরুদ্ধেও গর্জে ওঠে তরুণ সমাজ। তারা স্পষ্ট ভাষায় স্লোগান দেয়—"দিল্লি না ঢাকা? ঢাকা, ঢাকা!", "গোলামি না আজাদি? আজাদি, আজাদি!" এই স্লোগানগুলো প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ কখনোই কারো প্রেসক্রিপশনে চলবে না।
এক দফা এবং চূড়ান্ত বিজয় আগস্টের শুরুতেই শত লাশের পাহাড় ডিঙিয়ে আন্দোলনের গতিপথ গিয়ে ঠেকে এক দফায়। আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়—"এক দুই তিন চার, শেখ হাসিনা গদি ছাড়," "দফা এক দাবি এক, শেখ হাসিনার পদত্যাগ।" ৫ আগস্ট সকালে যখন লংমার্চ নিয়ে লাখো জনতা ঢাকার দিকে আসছিল, তখন স্লোগান ছিল—"ঢাকায় আসো জনতা, ছাড়তে হবে ক্ষমতা।" আর বিকেলে সেই স্লোগানই বিজয়ের উল্লাসে পরিণত হয়—"পালাইছে রে পালাইছে, হাসিনা পালাইছে!"
উপসংহার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের এই স্লোগানগুলো আজ নতুন বাংলাদেশের ‘ম্যাগনাকার্টা’ বা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। এগুলো শুধু ক্ষোভের প্রকাশ ছিল না, বরং আগামী দিনের রাজনীতি, সমাজ, গণমাধ্যম ও রাষ্ট্রের রূপরেখা কেমন হবে, তারই প্রতিচ্ছবি ছিল। এই অগ্নিঝরা স্লোগানগুলো ইতিহাসে চিরকাল সাক্ষী হয়ে থাকবে যে—রাজপথে মানুষের বুক আর মুখ যখন এক হয়ে যায়, তখন কোনো ফ্যাসিজমই টিকতে পারে না।
Comments (0)
Login to leave a comment.
No comments yet. Be the first to comment.
Related posts
জুলাই গণঅভ্যুত্থান ডকুমেন্টারি
জুলাই গণঅভ্যুত্থান
‘আংশিক বিজয়কে পূর্ণাঙ্গ করতে হবে’: ৫ আগস্ট বিকেলে ছাত্র-জনতাকে রাজপথে থাকার নির্দেশ
জুলাই গণঅভ্যুত্থান