36July
জুলাইয়ের ইতিহাস

. ঐতিহাসিক ৭২ ঘণ্টা: জেল ভাঙা আর লুটপাটের আতঙ্কের মাঝেই যেভাবে রাষ্ট্রের হাল ধরেছিল শিক্ষার্থীরা

by Ataullah Rahman Polas · · 24 views
. ঐতিহাসিক ৭২ ঘণ্টা: জেল ভাঙা আর লুটপাটের আতঙ্কের মাঝেই যেভাবে রাষ্ট্রের হাল ধরেছিল শিক্ষার্থীরা

ঢাকা — ১৭ কোটি মানুষের একটি দেশে কোনো প্রধানমন্ত্রী নেই, মন্ত্রিসভা নেই, এমনকি রাস্তায় মানুষের নিরাপত্তার জন্য একজন পুলিশ সদস্যও নেই—আধুনিক বিশ্বে এমন ঘটনা কল্পনা করাও কঠিন। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর, বাংলাদেশ ঠিক এমনই এক নজিরবিহীন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল। ৬ আগস্ট থেকে ৮ আগস্ট রাত পর্যন্ত টানা ৭২ ঘণ্টা কার্যত কোনো নির্বাহী সরকার বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ছাড়াই চলেছে পুরো দেশ।

এই ৭২ ঘণ্টা একদিকে যেমন ছিল চরম নৈরাজ্য ও আতঙ্কের, অন্যদিকে ঠিক তেমনই ছিল তারুণ্যের এক অবিশ্বাস্য নাগরিক রূপান্তরের গল্প।


সাংবিধানিক শূন্যতা ও পুলিশের কর্মবিরতি

৬ আগস্ট তৎকালীন রাষ্ট্রপতি সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করলে দেশ এক গভীর আইনি শূন্যতায় পড়ে। এর মধ্যেই সারা দেশের থানাগুলোতে হামলার জেরে ৬ আগস্ট বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন দেশব্যাপী কর্মবিরতি ঘোষণা করে। ফলে দেশের ৬৩৯টি থানা মুহূর্তেই পুলিশশূন্য হয়ে পড়ে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পরামর্শে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া চলতে থাকলেও, মাঠপর্যায়ে রাষ্ট্রের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না।


রক্তপাত, জেল ভাঙা ও লুটপাটের নৈরাজ্য

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই অনুপস্থিতির সুযোগে দেশজুড়ে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়। তথ্য অনুযায়ী, ৪ থেকে ৬ আগস্ট এই তিন দিনেই রাজনৈতিক সংঘাত ও হামলায় অন্তত ৩২৬ জন নিহত হন।

দেশের বিভিন্ন কারাগারে বিদ্রোহ দেখা দেয়। গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে মই ও রশি বানিয়ে ফাঁসির আসামিসহ ২২৩ জন কয়েদি পালিয়ে যায়। কুষ্টিয়া ও জামালপুর কারাগারেও বিদ্রোহ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে গাজী টায়ার্স কারখানায় টানা চার দিন ধরে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ চলে। রাতে পুলিশ না থাকায় পাড়া-মহল্লায় ডাকাত আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, বাধ্য হয়ে সাধারণ মানুষ লাঠি ও বাঁশি হাতে রাত জেগে পাহারা দেওয়া শুরু করেন।


ধ্বংসস্তূপের মাঝে তারুণ্যের সরকার

রাষ্ট্রযন্ত্র যখন পুরোপুরি অকার্যকর, তখন ধ্বংসস্তূপের মাঝেই আশার আলো হয়ে দাঁড়ায় দেশের তরুণ সমাজ। কার্যত সরকারবিহীন দেশে সাধারণ শিক্ষার্থীরাই যেন হয়ে ওঠেন সত্যিকারের সরকার।

টানা তিন দিন ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন স্থানে ট্রাফিক ব্যবস্থার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেন স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় গাড়ি সামলেছেন, অ্যাম্বুলেন্সকে জরুরি পথ করে দিয়েছেন। শুধু ট্রাফিক ব্যবস্থাই নয়, তারা হাতে ঝাড়ু তুলে নিয়ে সড়ক পরিষ্কার করেছেন, দেয়ালে দেয়ালে সম্প্রীতির গ্রাফিতি এঁকেছেন এবং রাতে বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা ও মন্দির পাহারার দায়িত্ব নিয়েছেন।


অবসান ও নতুন শুরু

অবশেষে ৮ আগস্ট দুপুর ২টা ১০ মিনিটে ফ্রান্সের প্যারিস থেকে ঢাকায় এসে পৌঁছান শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বিমানবন্দরে নেমেই শহীদ আবু সাঈদের কথা স্মরণ করে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। ওই দিন রাতেই বঙ্গভবনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন তিনি। আর এরই মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসান ঘটে বাংলাদেশের সেই ঐতিহাসিক ও শ্বাসরুদ্ধকর সরকারহীন ৭২ ঘণ্টার।


উপসংহার

বাংলাদেশের ইতিহাসের এই ৭২ ঘণ্টা এক অদ্ভুত অধ্যায় হয়ে থাকবে। রাষ্ট্রযন্ত্র ভেঙে পড়লে সমাজ কত দ্রুত অরাজকতার দিকে যেতে পারে, এটি যেমন তার প্রমাণ, তেমনি সরকার না থাকলেও সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা কীভাবে নিজেদের কাঁধে পুরো দেশের দায়িত্ব তুলে নিতে পারে—এটি তারও এক অনন্য ও অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত।


Comments (0)

Login to leave a comment.

No comments yet. Be the first to comment.


Related posts