36July
জুলাই স্মৃতি

গণভবন থেকে ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’: স্বৈরাচারের পতনের চিহ্ন ও শহীদদের রক্তমাখা স্মৃতির জীবন্ত দলিল

by Ataullah Rahman Polas · · 20 views
গণভবন থেকে ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’: স্বৈরাচারের পতনের চিহ্ন ও শহীদদের রক্তমাখা স্মৃতির জীবন্ত দলিল

ঢাকার শেরেবাংলা নগরের যে সুরম্য প্রাসাদে বসে একসময় রচিত হতো ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার নানা কূটকৌশল, সেই গণভবন আজ রূপান্তরিত হয়েছে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’-এ। ১১১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই জাদুঘরটি নিছক কোনো সংগ্রহশালা নয়, বরং এটি ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার রক্তস্নাত বিজয়ের এক অবিস্মরণীয় স্মারক। গত ৫ আগস্ট (২০২৬) আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের পর ৬ আগস্ট থেকে এটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে।

জাদুঘরে পা রাখতেই দর্শনার্থীদের স্বাগত জানায় দেয়ালজুড়ে আঁকা রাজপথের নানা প্রতিবাদী গ্রাফিতি। প্রবেশদ্বার ও প্রাথমিক গ্যালারিগুলো সাজানো হয়েছে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের বীরত্বগাথা এবং বাংলাদেশের ঐতিহাসিক অর্জনের নানা চিত্র দিয়ে।


কালের নির্মম প্রতিশোধ ও শহীদদের স্মৃতি জাদুঘরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও আবেগময় স্থানটি হলো সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিলাসবহুল শয়নকক্ষ। যে খাটে বসে একসময় স্বৈরাচারী শাসন টিকিয়ে রাখার ছক কষা হতো, আজ কালের নির্মম প্রতিশোধে সেই খাটের ওপরই থরে থরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত শহীদদের রক্তমাখা জামা-প্যান্ট ও পরিচয়পত্র। কাঁচের শোকেসে সযত্নে সংরক্ষিত আছে শহীদ আবু সাঈদের ১৫ নম্বর এবং শহীদ আসিফের ১৯ নম্বর জার্সি। এছাড়া রয়েছে শহীদ ফয়সালের জার্সি, গামছা, টুপি ও চশমা।

পাশেই উন্মুক্ত রাখা হয়েছে ক্ষমতাচ্যুত শাসকের ব্যবহৃত আলোচিত ‘লাল টেলিফোন’। রিসিভার কানে তুললেই দর্শনার্থীরা শুনতে পাচ্ছেন সে সময়কার নানা অডিও বার্তা। জাদুঘরের একটি মনিটরে অবিরাম বাজছে শহীদ মুগ্ধর সেই হৃদয়বিদারক আর্তি—"পানি লাগবে, পানি?"


শিল্পকর্মে মূর্ত হওয়া বিভীষিকা ও আয়নাঘর আন্দোলনের নির্মম ও সাহসী মুহূর্তগুলো জীবন্ত হয়ে উঠেছে ভাস্কর্য আর শিল্পকর্মে। শিল্পী তেজস হালদার জসের তৈরি ভাস্কর্যে ফুটে উঠেছে সাভারে পুলিশের এপিসি থেকে শহীদ ইয়ামিনের নিথর দেহ নিচে ফেলে দেওয়ার দৃশ্য, রিকশাচালক নূর মোহাম্মদের সাহসিকতা এবং রিকশাচালক সুজনের আইকনিক স্যালুট। ২০০৯ সালের পিলখানা ট্র্যাজেডি নিয়ে ফাইবার গ্লাসের ভাস্কর্য তৈরি করেছেন শিল্পী আমিনুল ইসলাম আশিক।

জাদুঘরে শুধু জুলাই অভ্যুত্থান নয়, বিগত ১৫ বছরের গুম-খুন ও ফ্যাসিবাদের ভয়াল চিত্রও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। দর্শনার্থীদের শিউরে ওঠার মতো একটি জায়গা হলো কুখ্যাত ‘আয়নাঘর’-এর প্রতিচ্ছবি, যেখানে ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর চালানো হতো বর্বরোচিত নির্যাতন। এছাড়া জাদুঘর প্রাঙ্গণেই তৈরি করা হয়েছে একটি প্রতীকী গণকবর, যেখানে খোদাই করা আছে শহীদদের নাম।


দর্শনার্থীদের ক্ষোভ, আক্ষেপ ও দাবি জাদুঘরটি দেখতে প্রতিদিন হাজারো মানুষ ভিড় জমালেও ব্যবস্থাপনায় কিছু অসঙ্গতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দর্শনার্থীরা। অনেকের অভিযোগ, বীর শহীদ আবু সাঈদ ও মুগ্ধর ছবি বা স্মৃতিচিহ্নগুলোকে এখানে সঠিক মর্যাদা বা প্রাধান্য দেওয়া হয়নি। কিছু দর্শনার্থী মনে করছেন, একটি মহল হয়তো আসল তথ্য বা নির্দিষ্ট শহীদদের অবদান আড়াল করার চেষ্টা করছে।

অন্যদিকে, দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় থাকলেও জাদুঘরটিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা একেবারেই অপ্রতুল। মূল্যবান ও স্পর্শকাতর স্মৃতিচিহ্নগুলোতে দর্শনার্থীরা হাত দেওয়ায় সেগুলো নষ্ট বা হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এছাড়া, আগত দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে জাদুঘর প্রাঙ্গণে নারী ও পুরুষদের জন্য পৃথক মসজিদ নির্মাণের জোর দাবি উঠেছে।


Comments (0)

Login to leave a comment.

No comments yet. Be the first to comment.


Related posts