36July
জুলাইয়ের ইতিহাস

৫ আগস্টের গোপন নীল নকশা: জাতিসংঘের প্রতিবেদনে ফাঁস হলো হাসিনার শেষ মুহূর্তের পরিকল্পনা

by Ataullah Rahman Polas · · 20 views
৫ আগস্টের গোপন নীল নকশা: জাতিসংঘের প্রতিবেদনে ফাঁস হলো হাসিনার শেষ মুহূর্তের পরিকল্পনা

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঠেকাতে মরণকামড় দেওয়ার সব প্রস্তুতিই নিয়েছিল তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকার। আন্দোলনকারীদের ঠেকাতে পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে করা হয়েছিল এক নিখুঁত ‘নীল নকশা’। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায় সেনাবাহিনী ও বিজিবির কৌশলগত নীরবতায়।

সেদিনের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পুলিশের এক কমান্ডার জানিয়েছেন, "৫ আগস্ট সকাল থেকেই সেনাবাহিনী জানতো শেখ হাসিনার পতন হয়ে গেছে, কিন্তু পুলিশ জানতো না—তাই পুলিশ তখনও সরকারকে রক্ষা করতে সর্বাত্মকভাবে মাঠে ছিল।"

সম্প্রতি জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের (ওএইচসিএইচআর) একটি তথ্যানুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ৫ আগস্টের এই চাঞ্চল্যকর নেপথ্য তথ্য। ১২ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে ৫ আগস্টের কর্মসূচি (যাকে প্রতিবেদনে ‘মার্চ অন ঢাকা’ বলা হয়েছে) দমনে সরকারের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহ বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।


৪ আগস্টের দুই হাই-প্রোফাইল বৈঠক জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৫ আগস্টের কর্মসূচি মোকাবেলায় ৪ আগস্ট দু’দফায় উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সকালে শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের বৈঠক হয়। এতে সেনা, বিমান, নৌ, বিজিবি, ডিজিএফআই, এনএসআই, পুলিশ ও পুলিশের বিশেষ শাখার প্রধানরা অংশ নেন। উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র, শিক্ষা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীও। এই বৈঠকেই মার্চ টু ঢাকা ঠেকাতে অনির্দিষ্টকালের জন্য কঠোর কারফিউ জারির সিদ্ধান্ত হয় এবং আন্দোলনকারীদের ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে শক্ত হাতে দমনের নির্দেশ দেন শেখ হাসিনা।

একই দিন সন্ধ্যায় গণভবনে আবারও বৈঠক হয়। সেখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সশস্ত্র বাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার, সেনাবাহিনীর কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেলসহ অন্যান্য বাহিনীর প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই বৈঠকে একটি বিষয়ে ঐকমত্য হয় যে—প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে বিক্ষোভকারীদের ঢাকার প্রবেশপথে আটকে দেওয়া হবে। সিদ্ধান্ত হয়, সেনাবাহিনী ও বিজিবি সাঁজোয়া যান নিয়ে প্রবেশপথগুলো অবরুদ্ধ করবে এবং পুলিশ উচ্ছৃঙ্খল জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করবে।


মাঝরাতের হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা ৫ আগস্ট প্রথম প্রহর (রাত ১২:৫৫ মিনিট), শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনীর (এসএসএফ) তৎকালীন মহাপরিচালক বিজিবির মহাপরিচালককে পরপর দুটি হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা পাঠান। প্রথমটি ছিল আন্দোলনকারীদের ঢাকায় প্রবেশের পথ সম্পর্কিত একটি ফরোয়ার্ড করা বার্তা। দ্বিতীয়টিতে ছিল প্রতিরক্ষার প্রথম ও দ্বিতীয় লাইন, একটি দূরপাল্লার ইউনিট এবং ব্যাকআপ ফোর্সের রূপরেখার একটি ভিডিও।


ভেস্তে যায় নীল নকশা, নিষ্ক্রিয় ছিল সেনাবাহিনী ও বিজিবি ৫ আগস্ট সকালে পরিকল্পনা অনুযায়ী সেনাবাহিনী ও বিজিবির সদস্যরা রাজপথে দাঁড়ালেও, বাস্তবে তারা তাদের ওপর অর্পিত ভূমিকা পালন করেননি। একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, সেনাবাহিনী যে পরিমাণ ফোর্স মোতায়েনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা তারা করেনি। আরেকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, বিজিবি প্রতি ঘণ্টায় বিভিন্ন প্রবেশপথ দিয়ে প্রায় ১০ থেকে ১৫ হাজার বিক্ষোভকারীকে ঢাকায় বিনা বাধায় ঢুকতে দেয়।

সিসিটিভি ফুটেজে উত্তরা থেকে ৫০০-৬০০ বিক্ষোভকারীকে সেনাবাহিনীর বাধা ছাড়াই ঢাকার কেন্দ্রস্থলের দিকে আসতে দেখে তৃতীয় এক কর্মকর্তা বুঝতে পারেন, কিছু একটা গড়বড় হচ্ছে। অবস্থা বেগতিক দেখে চতুর্থ আরেকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে জানিয়ে দেন, "পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ হচ্ছে না।"


পুলিশের ভুল ধারণা ও রক্তপাত সেনাবাহিনী ও বিজিবি নিষ্ক্রিয় থাকলেও, পুলিশ তখনো বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী গুলি চালাচ্ছিল। কারণ হিসেবে জানা যায়, পুলিশের কাছে হাসিনা সরকারের পতনের কোনো আগাম তথ্য ছিল না। সরকারের নীল নকশা ভেস্তে গিয়ে সেদিন সেনাবাহিনী ও বিজিবির এই নিষ্ক্রিয় অবস্থানই মূলত লাখো জনতাকে ঢাকায় প্রবেশের পথ করে দেয় এবং দীর্ঘ ১৭ বছরের স্বৈরাচারের চূড়ান্ত পতন নিশ্চিত করে।


Comments (0)

Login to leave a comment.

No comments yet. Be the first to comment.


Related posts