36July
জুলাইয়ের ইতিহাস

৫ আগস্টের আশুলিয়া ট্র্যাজেডি: লাশের স্তূপ ও আগুনে পোড়া মানবতা, এক বর্বরোচিত ইতিহাসের সাক্ষী

by Ataullah Rahman Polas · · 40 views
৫ আগস্টের আশুলিয়া ট্র্যাজেডি: লাশের স্তূপ ও আগুনে পোড়া মানবতা, এক বর্বরোচিত ইতিহাসের সাক্ষী

আশুলিয়া — ৫ আগস্ট ২০২৪। একদিকে যখন সারা দেশে স্বৈরশাসনের পতনের খবরে ছাত্র-জনতার বিজয়োল্লাস, অন্যদিকে ঢাকার অদূরে আশুলিয়ায় তখন রচিত হচ্ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম ঘৃণ্য ও বর্বরোচিত এক অধ্যায়। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত এই দিনে আশুলিয়া থানা এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর যে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়, তা দেশের প্রতিটি মানুষের হৃদয়কে স্তব্ধ করে দিয়েছে।

নির্বিচার গুলি ও হত্যাযজ্ঞ স্বৈরাচারী সরকারের পতনের ঠিক আগমুহূর্তে ক্ষমতার মসনদ টিকিয়ে রাখার মরিয়া চেষ্টায় পুলিশ ও সরকার দলীয় সশস্ত্র ক্যাডাররা আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে। সেদিন আশুলিয়ার রাজপথে নেমে আসা মুক্তিকামী ছাত্র, শ্রমিক ও সাধারণ জনতার ওপর চালানো হয় বৃষ্টির মতো গুলি। মুহূর্তের মধ্যেই লুটিয়ে পড়েন অসংখ্য নিরীহ মানুষ। রক্তে রঞ্জিত হয় পিচঢালা পথ।

প্রমাণ নিশ্চিহ্নে লাশে আগুন: এক পৈশাচিক উল্লাস আশুলিয়ার এই হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে ভয়ংকর ও অমানবিক দিকটি ছিল প্রমাণ গুম করার চেষ্টা। হত্যার পর ঘাতকদের নির্মমতা এখানেই থেমে থাকেনি। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ ও পরবর্তীতে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ফুটেজে দেখা যায়, গুলিবিদ্ধ নিথর দেহগুলোকে একটি ভ্যান বা পিকআপের ওপর স্তূপ করে রাখা হয়েছে। এরপর সেই মৃতদেহগুলোতে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। মানুষের পোড়া গন্ধে সেদিন ভারী হয়ে উঠেছিল আশুলিয়ার আকাশ-বাতাস। মৃতদেহের প্রতি এমন চরম অবমাননা ও পৈশাচিকতা বিশ্ববিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে।

স্বজনদের আর্তনাদ ও পরিচয়হীন লাশ এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞে এমন অনেক শহীদ আছেন, যাদের চেহারা পর্যন্ত শনাক্ত করতে পারেননি তাদের পরিবার। আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়া মাংসবিহীন হাড়গোড় বুকে জড়িয়ে কাঁদতে হয়েছে মায়েদের। অনেক পরিবার তাদের নিখোঁজ সন্তানের বিন্দুমাত্র চিহ্নও খুঁজে পায়নি। তিল তিল করে গড়ে তোলা হাজারো মায়ের স্বপ্ন সেদিন পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল ঘাতকের দেওয়া আগুনে।

বিচারের কাঠগড়ায় স্বৈরাচার নতুন বাংলাদেশে এখন সর্বস্তরের মানুষের একটাই দাবি—আশুলিয়ায় যারা নিরীহ মানুষের বুকে গুলি চালিয়েছে এবং মৃতদেহ পুড়িয়ে উল্লাস করেছে, তাদের প্রতিটি খুনিকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। নির্দেশদাতা থেকে শুরু করে সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া কাউকেই যেন ছাড় দেওয়া না হয়, সেটিই এখন শহীদ পরিবারের একমাত্র চাওয়া।

উপসংহার ৫ আগস্টের আশুলিয়া ট্র্যাজেডি শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়, এটি ক্ষমতার দাম্ভিকতায় অন্ধ হয়ে যাওয়া এক স্বৈরাচারী ব্যবস্থার ভয়ংকর রূপের প্রতিচ্ছবি। আশুলিয়ার শহীদদের এই আত্মত্যাগ ও তাদের ওপর হওয়া বর্বরোচিত নির্যাতন নতুন বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরকাল এক বেদনাবিধুর অথচ স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামের জ্বলন্ত প্রমাণ হিসেবে লেখা থাকবে। রক্তস্নাত এই আত্মত্যাগের ওপর দাঁড়িয়েই একটি বৈষম্যহীন ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের দায়িত্ব এখন পুরো জাতির।


Comments (0)

Login to leave a comment.

No comments yet. Be the first to comment.


Related posts