36July
জুলাইয়ের ইতিহাস

‘৩৫ জুলাই’ বা ৪ আগস্টের রক্তস্নাত দিন: যেভাবে মাত্র একটি সিদ্ধান্তে বদলে যায় স্বৈরাচার পতনের ইতিহাস

by Ataullah Rahman Polas · · 20 views
‘৩৫ জুলাই’ বা ৪ আগস্টের রক্তস্নাত দিন: যেভাবে মাত্র একটি সিদ্ধান্তে বদলে যায় স্বৈরাচার পতনের ইতিহাস

ঢাকা — ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট, যা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ক্যালেন্ডারে পরিচিত ‘৩৫ জুলাই’ হিসেবে। সরকার পতনের এক দফা দাবিতে দেশজুড়ে চলছিল সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন। দিনটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম এক রক্তাক্ত ও বিভীষিকাময় দিন। একদিকে পুলিশ ও র‍্যাব, অন্যদিকে প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে মাঠে নামা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ক্যাডাররা। দেশজুড়ে সেদিন প্রাণ হারান শতাধিক মানুষ। তবে এত রক্তের বিনিময়ে সেদিন বিকেলে নেওয়া সমন্বয়কদের মাত্র একটি কৌশলগত সিদ্ধান্তই বদলে দেয় পুরো আন্দোলনের গতিপথ এবং নিশ্চিত করে স্বৈরাচারের পতন।


রণক্ষেত্র বাংলাদেশ এবং শতাধিক মৃত্যু ৪ আগস্ট সকাল থেকেই রাজধানী ঢাকাসহ পুরো দেশ পরিণত হয় যুদ্ধনগরীতে। ঢাকা, সিরাজগঞ্জ, ফেনীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আন্দোলনকারীদের ওপর সরাসরি গুলি ছুড়তে দেখা যায় শাসক দলের নেতাকর্মীদের।

সেদিন ঢাকার ফার্মগেটে পুলিশের গুলিতে নিহত হন একাদশ শ্রেণির ছাত্র গোলাম নাফিজ। রিকশার পাদানিতে তার রক্তাক্ত নিথর দেহ হাসপাতালে নেওয়ার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ক্ষোভে ফেটে পড়ে পুরো দেশ। অন্যদিকে, সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় কয়েক হাজার বিক্ষুব্ধ জনতা হামলা ও লুটপাট চালায়। সেই হামলায় এনায়েতপুর থানার তৎকালীন ওসি আব্দুর রাজ্জাকসহ ১৫ জন পুলিশ সদস্য এবং ৩ জন আন্দোলনকারী নিহত হন।

বিকেলে ঢাকা মেডিকেল থেকে ৪ নিহতের মরদেহ নিয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থান নেন বিক্ষোভকারীরা। শাহবাগে যাওয়ার পথে সেই মিছিলেও পুলিশ বাধা দেয়। এত রক্ত আর মৃত্যুর মিছিল স্বাধীন বাংলাদেশ এর আগে কখনো দেখেনি।


সরকারের মরিয়া পদক্ষেপ ও ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট পরিস্থিতি হাতছাড়া হতে দেখে ৪ আগস্ট দুপুরের পর থেকেই দেশজুড়ে ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপসহ মেটার সব সেবা এবং মোবাইল ইন্টারনেট পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় সরকার। চলমান এই গণআন্দোলনকে ‘জঙ্গি হামলা’ বলে আখ্যায়িত করে শেখ হাসিনার সরকার। সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করা হয় এবং সেই সাথে তিন দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়।


ঐতিহাসিক মোড়: ‘মার্চ টু ঢাকা’ এগিয়ে আনার নেপথ্যের গল্প আন্দোলনের সূচি অনুযায়ী, ছাত্র-জনতার চূড়ান্ত কর্মসূচি ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল ৬ আগস্ট। ৫ আগস্ট দেওয়া হয়েছিল তুলনামূলক সফট বা শিথিল কর্মসূচি। কিন্তু ৪ আগস্ট বিকেলে হঠাৎ করেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ঘোষণা দেন, ৬ আগস্ট নয়, পরদিন ৫ আগস্টই ‘মার্চ টু ঢাকা’ অনুষ্ঠিত হবে।

হঠাৎ কেন এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন? সমন্বয়কদের মতে, তাদের কাছে গোয়েন্দা ও বিভিন্ন মাধ্যমে তথ্য আসে যে, ৫ আগস্ট সরকার একটি বড় ধরনের ‘ম্যাসাকার’ বা হত্যাযজ্ঞ চালানোর পরিকল্পনা করেছে। শেখ হাসিনা তার পেটোয়া বাহিনীকে ঢাকায় জড়ো করে পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ছক কষছিলেন।

সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ জানান, "ওই সময়ে চান্স নেওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। একবার ফেইল করলে স্ট্র্যাটেজিক্যালি পরে আর উঠে দাঁড়ানোর সুযোগ হতো না। হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হতো। তাই পূর্ববর্তী কর্মসূচি ঘোষণার দুই-তিন ঘণ্টার মধ্যেই আমরা তা চেঞ্জ করে একদিন এগিয়ে আনি।"

জাতীয় নাগরিক কমিটির যুগ্ম সদস্য সচিব তারেক রেজা বলেন, "একটা দিন হাসিনার হাতে সময় দিলে সে ঢাকার সব পথ বন্ধ করে ভিন্ন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারতো। এতে করে অনেকেই হয়তো ঢাকায় আসতে পারতো না। কিন্তু ওই মুহূর্তে ঢাকায় যে পরিমাণ মানুষ ছিল, তা হাসিনার পতনের জন্য যথেষ্ট ছিল।"


সেনাবাহিনীর প্রতি আহ্বান ও চূড়ান্ত বিজয় একই দিন, সশস্ত্র বাহিনীকে ছাত্র-জনতার মুখোমুখি না দাঁড়ানোর আহ্বান জানান সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তারা। সরকারের সব কৌশল ও ছক ব্যর্থ করে দিয়ে ৪ আগস্টের সেই একটিমাত্র ঘোষণাই পুরো পরিস্থিতি বদলে দেয়। ৫ আগস্ট সকাল থেকে ঢাকার সমস্ত রাজপথ গিয়ে মিশেছিল গণভবনের মোহনায়। যার ফলশ্রুতিতে তাসের ঘরের মতো পতন হয় ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদের।

৪ আগস্ট বা ‘৩৫ জুলাই’ তাই শুধু একটি রক্তাক্ত দিন নয়, এটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ও কৌশলগত বিজয়ের দিন।


Comments (0)

Login to leave a comment.

No comments yet. Be the first to comment.


Related posts