36July
জুলাইয়ের ইতিহাস

৩ আগস্টের ঐতিহাসিক সেনা বৈঠক: তরুণ অফিসারদের ক্ষোভ ও সেনাপ্রধানের ‘গুলি না চালানোর’ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

by Ataullah Rahman Polas · · 24 views
৩ আগস্টের ঐতিহাসিক সেনা বৈঠক: তরুণ অফিসারদের ক্ষোভ ও সেনাপ্রধানের ‘গুলি না চালানোর’ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

ঢাকা — ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট। তীব্র গণঅভ্যুত্থানে তখন উত্তাল পুরো দেশ। আন্দোলন দমনে সারা দেশে সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছিল শেখ হাসিনা সরকার। পুরো দেশ তখন তাকিয়ে ছিল সেনাবাহিনীর দিকে—তারা কি অন্য বাহিনীর মতো আন্দোলন দমনে অংশ নেবে, নাকি রক্তপাত থামাতে জনগণের পাশে দাঁড়াবে? ঠিক এমন চরম উত্তেজনার মুহূর্তে, ৩ আগস্ট সেনাসদরে অনুষ্ঠিত সেনাবাহিনীর অফিসারদের একটি ঐতিহাসিক সভাই মূলত নির্ধারণ করে দিয়েছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগ্য।

সেদিন দুপুর দেড়টায় শুরু হওয়া এই বৈঠকে দেশের সব সেনানিবাস থেকে সরাসরি ও ভার্চুয়ালি অংশ নিয়েছিলেন সামরিক কর্মকর্তারা। প্রায় দেড় ঘণ্টা স্থায়ী এই বৈঠকের সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও প্রস্থানকে নিশ্চিত করে।


উদ্বোধনী ভাষণ ও সেনাপ্রধানের গানের উদ্ধৃতি বৈঠকের শুরুতে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান প্রায় আধা ঘণ্টার একটি উদ্বোধনী ভাষণ দেন। তিনি জানান, সংকটময় মুহূর্তে সরকার চাইলে সেনাবাহিনী মোতায়েন হতে বাধ্য। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনারা কোথায় কত রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়েছে তার পরিসংখ্যান দিয়ে তিনি স্পষ্ট করেন, সেনারা কাউকে হত্যা করেনি।

এ সময় তিনি পরিস্থিতি বোঝাতে প্রয়াত শিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর দুটি গানের কথা উল্লেখ করেন। একটি হলো—"আমি তো প্রেমে পড়িনি, প্রেম আমার উপরে পড়েছে", যার মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, তিনি বা সেনাবাহিনী এই সংকট ডাকেননি, বরং সংকট নিজেই তাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এরপর তিনি আইয়ুব বাচ্চুর আরেকটি বিখ্যাত গানের লাইন উদ্ধৃত করে বলেন—"আর বেশি কাঁদালে উড়াল দেব আকাশে।" জাতির এমন ক্রান্তিলগ্নে সেনাপ্রধানের এই আবেগঘন গানের লাইন সকল সেনা কর্মকর্তাই গভীরভাবে উপলব্ধি করেন।


তরুণ অফিসারদের ক্ষোভ ও আবেগঘন বক্তব্য উদ্বোধনী ভাষণের পর সেনাপ্রধান তরুণ অফিসারদের মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতার কথা শুনতে চান। সেদিন সিনিয়রদের নিরুৎসাহিত করে ক্যাপ্টেন, মেজর ও লে. কর্নেল পদমর্যাদার ৬-৭ জন অফিসারকে সরাসরি মতামত দিতে বলা হয়।

একজন অফিসার চরম হতাশা প্রকাশ করে জানান, খুলনায় টহলরত সেনাদের উদ্দেশে আন্দোলনকারীরা যে অপমানজনক শব্দ ব্যবহার করেছে, তা স্বাধীন বাংলাদেশে কখনো শোনা যায়নি। তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে প্রশ্ন করেন, "কিসের জন্য, কার জন্য এই অপমান?"

সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত তৈরি হয় যখন রাজশাহী মেডিকেল কোর-এর এক নারী অফিসার বাংলায় লেখা একটি বক্তব্য পাঠ করেন। তিনি নিহত শিক্ষার্থী মীর মুগ্ধর প্রতিবেশী ছিলেন। মুগ্ধর কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, "দেশের প্রতিটি মা আজ এই মৃত্যুর জন্য কাঁদছেন।" তার এই বক্তব্য শুনে হেলমেট হলসহ ভার্চুয়ালি যুক্ত থাকা দেশের সব সেনানিবাসে পিনপতন নীরবতা নেমে আসে।

মোহাম্মদপুরের একটি ভাইরাল ভিডিও নিয়ে এক ক্যাপ্টেন তার অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, জনতার ঘেরাওয়ের মুখে আত্মরক্ষার্থে ফাঁকা গুলি চালাতে বাধ্য হওয়ায় পরিচিত মহলে তিনি ব্যাপক সমালোচনার শিকার হয়েছেন। তবে তার স্ত্রী তাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে মজা করে বলেছিলেন, ভিডিওতে তাকে নাকি "কিউট" দেখাচ্ছিল। এর জবাবে সেনাপ্রধান হাসতে হাসতে বলেন, "আমাকে কেউ কখনো কিউট বলেনি," যা গম্ভীর পরিবেশের মধ্যে কিছুটা হাস্যরসের জন্ম দেয়।


চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত: ‘জনগণের ওপর গুলি নয়’ তরুণ কর্মকর্তাদের মতামত শোনার পর দুপুর ২:৪০ মিনিটে স্বল্প বিরতি দিয়ে আবার বৈঠক শুরু হয়। বিরতির পর দ্বিতীয় পর্বটি ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। তরুণ কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান স্পষ্ট নির্দেশ দেন, "এখন থেকে জনগণের ওপর আর কোনো গুলি চলবে না।"

শুধু তাই নয়, তিনি জানান যে শিক্ষার্থীদের মিছিলে সেনা সদস্যরা কোনো বাধা দেবে না। এই বার্তার পরই সাধারণ মানুষের মধ্যে এক নতুন আত্মবিশ্বাস তৈরি হয় এবং দলে দলে মানুষ রাজপথে নামতে শুরু করে। পরদিন (৪ আগস্ট) রাওয়া ক্লাবে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তারাও ছাত্র-আন্দোলনের পক্ষে সংহতি প্রকাশ করেন।


Comments (0)

Login to leave a comment.

No comments yet. Be the first to comment.


Related posts